দখল-ভরাটে বিলীন ঐতিহ্যবাহী খাল, দুর্ভোগে কৃষক

জালাল উদ্দিন মনির, নবীনগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া)

দখল-ভরাটে বিলীন ঐতিহ্যবাহী খাল, দুর্ভোগে কৃষক

দখল আর খননের অভাবে জমির পেটে মিশে ড্রেনে পরিণত হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার আলীয়াবাদ বিলের খাল। বিলের পানি নিষ্কাশন হতে না পেরে তলিয়ে যায় ইরি-বোরো ধানের ফসলি জমি। শুকনো মৌসুমে পানি না থাকায় সেচ কাজে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয় এ এলাকার শত শত কৃষককে। উপজেলার শ্রীরামপুর মৌজার ২৪৫ দাগের ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত খালটি জেলা এলএ শাখায় কুট্টাপাড়া ফিসারি জলমহল হিসেবে পরিচিত। ম্যাপে ২ হাজার ৪০০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৬০ থেকে ১০০ ফুট প্রস্থ থাকলেও সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, এটি এখন মাত্র তিন-চার ফুটের একটি ড্রেনের নমুনা।

বিজ্ঞাপন

জানা যায়, বুড়ি নদী থেকে শুরু হয়ে মাঝিকাড়া ও আলীয়াবাদ গ্রামের উত্তর পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে খালটি ভাটা নদীতে গিয়ে মিশেছে। ১৯৭৯ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এই খালের পাড় দিয়ে হেঁটে গিয়ে ভাটা নদী খনন কাজের উদ্বোধন করেছিলেন। এ সময় মাথায় সাদা টুপি, পরনে সাদা গেঞ্জি ও সামনে মাটি কাটার কোদাল রেখে তিনি এই খালের পাড়ে বসে কিছু সময় বিশ্রাম নিয়েছিলেন।

স্থানীয় সার্ভেয়ারের মাধ্যমে ম্যাপ পরিমাপ করে দেখা যায়, শত বছরের পুরোনো খালটির দৈর্ঘ্য প্রায় ২ হাজার ৪০০ ফুট, প্রস্থ ৬০ থেকে ৮০ ফুট, কোনো কোনো জায়গায় ১০০ ফুট। গত কয়েক যুগ ধরে এ খালের খনন কাজ না হওয়ার সুযোগে অবাধে দখল হয়েছে, জমির সমান্তরাল করে করা হয়েছে ভরাট। ফলে খাল তার নিজস্ব পরিচয় হারিয়ে ড্রেনে পরিণত হয়েছে।

বন্ধ হয়ে গেছে পানি চলাচল। সামান্য বৃষ্টিতেই বিলে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়ে নষ্ট হয়ে যায় ফসল। বর্ষাকালে স্রোত না থাকায় বিলের পানি বিষাক্ত হয়ে ওঠে। জমে থাকে কচুরিপানা। পানিতে নামতে গেলেই চুলকানিসহ বিভিন্ন রোগজীবাণুর সংক্রমণ দেখা দেয়। মরে যায় বিলের মাছসহ বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণী।

স্থানীয় জেলেরা জানান, বর্ষা ও শুকনো উভয় মৌসুমেই এই খালে ভরপুর মাছ থাকত। মাছ বিক্রি করে তাদের জীবিকা নির্বাহ হতো। খালটি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার কারণে এখন সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

আলীয়াবাদ গ্রামের বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মান্নান বলেন, আমার আব্বা বারো মাস এই খাল থেকে মাছ ধরতেন। ছোটবেলায় আমরাও মাছ ধরতে যেতাম, সাঁতার কাটতাম। মাছে ভরপুর থাকত। বিলের সব মাছ এই খাল দিয়ে নামানো হতো। খালের পাড়ে অনেকেই গরু চরাতেন, গোসল করাতেন। আবার অনেকে খালপাড়ে পেঁয়াজ, রসুন, মরিচ ও বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করতেন। বর্ষাকালে চলত পাল তোলা নৌকা। শোনা যেত মাঝি-মাল্লার গান। অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই খালের সঙ্গে। এখন দেখে বোঝার উপায় নেই, এখানে এক সময় ছিল খরস্রোতা খাল।

আলীয়াবাদ গ্রামের বয়োবৃদ্ধ জহিরুল হক সর্দার বলেন, আলীয়াবাদ, মাঝিকাড়া ও নবীনগর শহরের বেশির ভাগ বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের অন্যতম মাধ্যম ছিল এই খাল। স্বাধীনতার আগে করিম চেয়ারম্যানের মাধ্যমে একবার খনন কাজ হয়েছিল। এরপর তেমনভাবে আর খনন না হওয়ায় যে যার মতো করে খালের পাড় কেটে খাল ভরাট করে জমির সমান্তরাল করে ফেলেছে। তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন সময় শুনতে পাই, কেউ কেউ নাকি খালের জায়গা লিজ এনেছে।

আলীয়াবাদ গ্রামের বাসিন্দা ইউনুস আলী, ইকবাল হোসেন বসু, হুমায়ুন কবির, মাসুদ করিম, কবির হোসেন, কাজল মিয়া, জাহের মিয়া ও আবদুর রউফ বলেন, চলতি মাসের কালবৈশাখী ঝড় ও টানা বৃষ্টির সময় খাল দিয়ে পানি নিষ্কাশন হতে না পেরে অসংখ্য জমির পাকা ধান পানির নিচে তলিয়ে গিয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তারা আরও বলেন, শুকনো মৌসুমে কৃষিজমিতে সেচের পানি দেওয়ার একমাত্র মাধ্যম ছিল এই খাল। বর্তমানে খালটি ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে শুকনো মৌসুমে সেচের পানির অভাবে অনেক জমি অনাবাদি রয়ে যায়। আবার সামান্য বৃষ্টি হলেই ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে যায়। উর্বরতার জন্য জমিতে দেওয়া সার ও কীটনাশক পানির সঙ্গে ভেসে যায়। অপরদিকে বৃষ্টির পানির সঙ্গে বাসাবাড়ি ও নর্দমা থেকে আসা ময়লা-আবর্জনা জমিতে গিয়ে ফসল নষ্ট করে। এমন পরিস্থিতিতে সীমানা নির্ধারণ ও পুনঃখননের মাধ্যমে খালের প্রাণ ফিরিয়ে এনে বিল ও আশপাশের গ্রামের বৃষ্টির পানি অবাধে নিষ্কাশন এবং শুকনো মৌসুমে সেচ কাজের জন্য খালে পানি রাখার উপযোগী করে তোলার জন্য এমপি ও উপজেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তারা।

নবীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসান আমার দেশকে বলেন, আলীয়াবাদ বিলের খাল খননের অভাবে দখল হয়ে ভরাট হয়ে গেছে তথ্যটি আপনার মাধ্যমে এই প্রথম জানতে পারলাম। এ বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে এমপি মহোদয়ের সঙ্গে পরামর্শ করে জনগুরুত্বপূর্ণ এই খালটি চলমান খাল খনন কর্মসূচির তালিকায় অন্তর্ভুক্তিসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

নবীনগর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) খালিদ বিন মনসুর আমার দেশকে বলেন, আমার জানামতে শ্রীরামপুর মৌজার ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত ২৪৫ দাগের জায়গা কারো নামে লিজ দেওয়া হয়নি। খালের জায়গা লিজ দেওয়ার কোনো বিধানও নেই। কেউ যদি বলে থাকে এই জায়গা লিজ নিয়েছেন, তাহলে তারা লিজের প্রমাণপত্র নিয়ে আসুক। তখনই সবকিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে।

এআরবি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...