আট মাস পর ৮৩৬ পর্যটক নিয়ে মৌসুমের প্রথম জাহাজ সেন্টমার্টিনে

আট মাস পর ৮৩৬ পর্যটক নিয়ে মৌসুমের প্রথম জাহাজ সেন্টমার্টিনে

সেন্টমার্টিন দ্বীপে জাহাজের যাত্রা নিয়ে নানা অনিশ্চয়তা ও নাটকীয়তার পর অবশেষে কক্সবাজার-সেন্টমার্টিন নৌপথে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচলের অনুমতি মিলেছে। এবারের মৌসুমের প্রথম জাহাজ গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে ৮৩৬ জন যাত্রী নিয়ে যাত্রা করে সেন্টমার্টিন দ্বীপে পৌঁছেছে।

বিজ্ঞাপন

তিনটি জাহাজ চলাচলের অনুমতি পেলেও প্রথম দিন কেবল ‘এমভি বার আউলিয়া’ জাহাজটিই সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে যাত্রা করে। মোট ৮৩৬ জন পর্যটক আগেই এর টিকিট সংগ্রহ করেছিলেন। প্রথম দিন এমভি বার আউলিয়া যাত্রা শুরু করলেও অনুমতি পাওয়া অন্য দুটি জাহাজ শুক্রবার থেকে পর্যটক নিয়ে সেন্টমার্টিনে চলাচল শুরু করবে বলে জানিয়েছেন সেন্টমার্টিনগামী জাহাজ মালিকদের সংগঠন 'সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ' (স্কোয়াব)-এর সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর।

গতকাল বৃহস্পতিবার ভোরের আলো ফুটতেই কক্সবাজার শহরের উত্তর নুনিয়াছড়াস্থ বিআইডব্লিউটিএ ঘাটে বাড়তে থাকে পর্যটকদের আনাগোনা। কারও হাতে ব্যাগ, কারও চোখে নতুন গন্তব্যের স্বপ্ন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা এসব ভ্রমণপিপাসু মানুষের গন্তব্য নীল জলরাশি আর প্রবাল পাথরের অপূর্ব সৌন্দর্যে ঘেরা সেন্টমার্টিন। প্রবাল দ্বীপে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে উচ্ছ্বসিত পর্যটকেরা। সকাল সাড়ে ৭টায় হুইসেল বাজিয়ে ঘাট ছাড়ে পর্যটকবাহী জাহাজ এমভি বার আউলিয়া। এরপর সমুদ্রের ঢেউ ভেঙে প্রবাল দ্বীপের পথে শুরু হয় এর যাত্রা।

স্কোয়াব সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর বলেন, এবার পর্যটন মৌসুমে জাহাজ চলাচলের অনুমতি পেয়েছে তিনটি প্রতিষ্ঠান। তবে প্রথম দিনে কেবল বার আউলিয়া জাহাজটি যাত্রা করেছে। পর্যটক পরিবহনের সুযোগ সীমিত থাকলেও জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ায় আশাবাদী পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। সবার প্রত্যাশা, ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হবে দ্বীপকেন্দ্রিক পর্যটন কার্যক্রম।

বিআইডব্লিউটিএ সূত্র জানায়, প্রথম দিন একটি জাহাজ চলাচল করলেও পর্যায়ক্রমে এতে যুক্ত হবে অনুমোদন পাওয়া অন্য জাহাজগুলো।

পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, শুধু পর্যটক পরিবহন নয়, দ্বীপের পরিবেশ ও প্রতিবেশগত ভারসাম্য রক্ষাকেও দেওয়া হচ্ছে বিশেষ গুরুত্ব। পর্যটকদের যাতায়াত, অবস্থান ও দ্বীপে চলাচলের ক্ষেত্রে সরকারি বিধিনিষেধ অনুসরণের পাশাপাশি নিরাপত্তা ও পরিবেশ সুরক্ষায় কাজ করছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো।

সূত্র মতে, কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদীতে বুধবার সন্ধ্যায় নোঙর করা হয় পর্যটকবাহী তিনটি জাহাজ। যাত্রী পরিবহনের জন্য জাহাজগুলো সংস্কার ও সাজসজ্জার কাজ শেষ করে রাখা হয়েছিল। পর্যটকদের বসার চেয়ারসহ সব দরকারি সরঞ্জাম পরিবর্তন করে সকল প্রস্তুতি নিয়ে যাত্রার অপেক্ষায় ছিল জাহাজ কর্তৃপক্ষ।

এমভি বার আউলিয়া, এমভি কর্ণফুলি এক্সপ্রেস ও এমভি টেকনাফ—এই তিনটি জাহাজের সম্মিলিত যাত্রী ধারণক্ষমতা ২ হাজার ২৯৮ জন। এর মধ্যে এমভি বার আউলিয়ার ধারণক্ষমতা ৮৫০ জন, এমভি কর্ণফুলি এক্সপ্রেসের ৭৩২ জন এবং এমভি টেকনাফের ৭১৬ জন।

বুধবার সকাল থেকেই ঘোষণা দেওয়া হয়, বৃহস্পতিবার থেকে তিনটি জাহাজে করে পর্যটকেরা সেন্টমার্টিন যেতে পারবেন। এই ঘোষণার ভিত্তিতে জাহাজ কর্তৃপক্ষ টিকিট বিক্রিও শুরু করে এবং রাত ৮টা পর্যন্ত ৮০০-র বেশি টিকিট বিক্রি হয়। তবে সন্ধ্যা সাতটার দিকে জেলা প্রশাসকের চূড়ান্ত সম্মতি না পাওয়ায় বৃহস্পতিবার থেকে জাহাজ চলাচল অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল।

তবে শেষ পর্যন্ত পর্যটকদের আগে থেকে কেনা টিকিটের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে একটি জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে সাতটায় কক্সবাজার শহরের উত্তর নুনিয়াছড়া বিআইডব্লিউটিএ ঘাট থেকে এমভি বার আউলিয়া সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। বাকি দুটি জাহাজ শুক্রবার থেকে চলাচল করবে।

স্কোয়াব সাধারণ সম্পাদক জানান, জাহাজ চলাচলের অনুমোদন পেতে বুধবার পর্যন্ত মোট নয়টি জাহাজ আবেদন করে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও পূর্ণাঙ্গ নথি জমা দেওয়ার পর তিনটি জাহাজ অনুমোদন পেয়েছে এবং বাকি ছয়টি জাহাজের আবেদন এখনো প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব কক্সবাজার (টুয়াক)-এর সভাপতি আনোয়ার কামাল জানান, সেন্টমার্টিনগামী পর্যটকদের জন্য একমুখী (ওয়ানওয়ে) জাহাজভাড়া সর্বনিম্ন ১ হাজার ৮০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সর্বোচ্চ ভাড়ার টিকিটে কেবিনের সুবিধা রয়েছে। ট্যুরিজম বোর্ডের সার্ভারের মাধ্যমে টিকিট ইস্যু করা হচ্ছে। এ ছাড়া দেশজুড়ে শতাধিক এজেন্ট বুকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানান, আগে থেকে টিকিট সংগ্রহ করা অনেক পর্যটকের ভোগান্তির কথা বিবেচনায় নিয়ে বৃহস্পতিবার একটি জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়।

তিনি আরও জানান, পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল নির্বিঘ্ন করতে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে একটি সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে পর্যটক পরিবহন ও সেন্টমার্টিন ভ্রমণসংক্রান্ত বিষয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

উল্লেখ্য, ৫ নভেম্বর শুরু হওয়া এই জাহাজ চলাচল আগামী বছরের ১৫ মার্চ পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। শুরু থেকে শেষ দিন পর্যন্ত দ্বীপে রাত যাপনের সুযোগ পাচ্ছেন ভ্রমণপিপাসুরা। দীর্ঘ সময় পর পর্যটকদের জন্য দ্বীপ উন্মুক্ত হওয়ায় উচ্ছ্বসিত স্থানীয় বাসিন্দা, পর্যটক ও ব্যবসায়ীরা। পর্যটননির্ভর অর্থনীতিতে গতি ফেরার পাশাপাশি দীর্ঘদিনের সংকট কাটবে বলে আশা দ্বীপবাসীর। তবে পর্যটনের এই নতুন সম্ভাবনা যেন প্রবাল দ্বীপের প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতির কারণ না হয়, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন