‘৯টি ফোকাস পয়েন্ট ও ১২ মাসে ৩৩ সংস্কার’Ñস্লোগান সামনে রেখে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) নির্বাচনের ইশতেহার ঘোষণা করেছিল ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল ‘সম্প্রীতির শিক্ষার্থী জোট’। আবাসন ও যাতায়াত সংকট নিরসন, স্বাস্থ্যসম্মত খাবার, অটোমেশন, নারীবান্ধব ক্যাম্পাস, মৌলিক স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ৩৩টি সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনে অংশ নেয় প্যানেলটি।
গত বছরের ১৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত সপ্তম চাকসু নির্বাচনে ২৬ পদের মধ্যে ২৪টিতে জয়ী হন এই প্যানেলের প্রার্থীরা। পরে ২৩ অক্টোবর শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে দায়িত্ব পালন শুরু করেন নবনির্বাচিত প্রতিনিধিরা। গত ২৩ অক্টোবর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের এক বছরের মেয়াদ পূর্ণ হয়েছে। তবে মেয়াদ শেষে বেশকিছু বিষয়ে সফল হলেও ইশতেহারের পূর্ণ বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি তাদের পক্ষে।
চাকসু নেতাদের দেওয়া তথ্য, দায়িত্ব পালনকালে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এক বছরের কার্যক্রমে অনেকগুলো ছোট প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হলেও বড় প্রতিশ্রুতিগুলো এখনো পরিকল্পনা ও প্রক্রিয়াধীন পর্যায়ে রয়েছে। তবে বড় প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে এক বছর যথেষ্ট সময় নয় বলে মনে করছেন চাকসু নেতারা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন সংকট নিরসনে হলগুলোতে বর্ধিত অংশ ও টিনশেড নির্মাণের মাধ্যমে অন্তত ১০ শতাংশ নতুন আবাসন বাড়ানোর পাশাপাশি বহুতলবিশিষ্ট নতুন হল নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল। তবে দায়িত্বের এক বছরেও এসব প্রতিশ্রুতির পূর্ণ বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।
চাকসু নেতাদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, গত এক বছরে নতুন করে মাত্র ২০০ শিক্ষার্থীর আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া প্রায় ৮০০ শিক্ষার্থীর আবাসন সুবিধা বাড়াতে অবকাঠামোগত সংস্কারকাজ চলমান রয়েছে। অন্যদিকে, এক হাজার আসনের একটি ছাত্রী হল নির্মাণের বাজেট অনুমোদন এবং ১০ তলাবিশিষ্ট পাঁচটি ছাত্র হল ও পাঁচটি ছাত্রী হল নির্মাণের জন্য উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রক্রিয়াধীন।
যাতায়াতব্যবস্থায় অগ্রগতি
শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের ভোগান্তি কমাতে শাটল ট্রেনের সংখ্যা ও বগি বাড়ানো, শহর থেকে ক্যাম্পাস পর্যন্ত রেলের দ্বিতীয় লাইন স্থাপনের প্রকল্প গ্রহণ, শাটল ট্র্যাকার অ্যাপ চালু, ই-কারের সংখ্যা বাড়ানো, শহরের বিভিন্ন প্রান্তে শাটল বাস এবং পাশের উপজেলাগুলোতে বাস সার্ভিস চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল।
এর মধ্যে বেশ কয়েকটি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করেছে চাকসু। তবে রেলের দ্বিতীয় লাইন স্থাপনের প্রস্তাব রেলপথ মন্ত্রণালয়ে অনুমোদন পেলেও তা বাস্তবায়নে সময় লাগবে। পাশাপাশি বিনামূল্যে শাটল বাস সার্ভিস চালুর কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন বলে জানা গেছে।
স্বাস্থ্যসেবা এবং সুযোগ-সুবিধায় অগ্রগতি
বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারকে ২৫ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে উন্নীত করা, চিকিৎসক ও অ্যাম্বুলেন্সের সংখ্যা বৃদ্ধি, অপারেশন থিয়েটার স্থাপন এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতে মেডিকেল হেল্পলাইন চালুসহ বেশকিছু প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল প্যানেলটি।
প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে বিনামূল্যে প্রায় ৪,০০০ শিক্ষার্থীকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া এবং ১২টি আবাসিক হলে মেডিসিন কর্নার স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া একটি বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসাসেবায় ৫০ শতাংশ ছাড়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
পাশাপাশি তিনটি অ্যাম্বুলেন্স বৃদ্ধি, মিনি অপারেশন থিয়েটার চালু, ওষুধের পরিমাণ ও বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং নারী-পুরুষ চিকিৎসকসহ ২০টি নতুন পদ সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। অন্যদিকে ২৫ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল নির্মাণ ও স্বাস্থ্যবীমা চালুর বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন বলে জানান চাকসু নেতারা।
শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যসম্মত খাবার নিশ্চিতে আবাসিক হলগুলোর ডাইনিং, ক্যান্টিন ও বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার হোটেলগুলোতে খাবারের মান ও মূল্য নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত তদারকি করা হয়েছে। পাশাপাশি ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে অভিযান পরিচালনা এবং বিভিন্ন আবাসিক হলে ডিপ ফ্রিজ ও বিশুদ্ধ পানির ফিল্টার স্থাপন করা হয়েছে।
নারী শিক্ষার্থীদের জন্য দেওয়া প্রতিশ্রুতির মধ্যে বিনামূল্যে মেডিকেল ক্যাম্প, স্যানিটারি ভেন্ডিং মেশিন এবং তিন অনুষদের ক্যান্টিনে পৃথক ফিমেল জোন চালু করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে নারীদের নামাজের স্থান, যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধ সেল শক্তিশালী এবং সাইবার বুলিং প্রতিরোধে পৃথক সেল গঠনের উদ্যোগও নিয়েছে প্যানেলটি।
শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পরিবেশ উন্নয়নেও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে নামাজের স্থান, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহে জেনারেটর এবং পর্যাপ্ত ফ্যান ও লাইট সংযোজন করা হয়েছে। ১৪টি হলের লাইব্রেরিতে চাকরির প্রস্তুতিমূলক এবং উচ্চশিক্ষাবিষয়ক বই সরবরাহ করা হয়েছে। এছাড়া কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে তিনটি ডেস্কটপ কম্পিউটার, দুটি ল্যাপটপ ও দুটি ফটোকপি মেশিন স্থাপন করা হয়েছে। তিন হলের রিডিংরুমে এসি স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া টিএসসি নির্মাণের বাজেট অনুমোদন হয়েছে। আবাসিক হলে প্রয়োজনীয় শরীরচর্চা সরঞ্জাম সরবরাহের কাজ চলমান রয়েছে বলে জানা গেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১টি বিভাগের ল্যাবরেটরির উন্নয়নে দুই কোটি টাকা বরাদ্দের ব্যবস্থা এবং ১০ হাজার শিক্ষার্থীকে ইসলামী ব্যাংকের ডুয়েল কারেন্সি ডেবিট কার্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেম, সার্টিফিকেট উত্তোলনসংক্রান্ত সফটওয়্যার ও ১০টি উচ্চ কনফিগারেশনের কম্পিউটার নিয়ে ডিজিটাল লার্নিং হাব স্থাপন করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স, এমফিল ও পিএইচডি গবেষকদের জন্য মাসিক বৃত্তি এবং প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য এককালীন বৃত্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে। ক্যারিয়ার উন্নয়ন ও উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতিতে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ, সেমিনার ও কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে।
তবে চাকসু নির্বাচন বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ক্যালেন্ডারে অন্তর্ভুক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল। এছাড়া ক্যাম্পাসের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, অন-ক্যাম্পাস জব চালু এবং শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি সিকিউরিটি ফোর্স গঠনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি।
যা বলছেন শিক্ষার্থী ও ছাত্রনেতারা
শিক্ষার্থীরা জানান, চাকসু নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যে বেশকিছু উদ্যোগ বাস্তবায়িত হওয়ায় তারা সন্তুষ্ট। এছাড়া যেকোনো প্রয়োজনে ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে চাকসু নেতাদের কাছে নিজেদের সমস্যা তুলে ধরার সুযোগও তৈরি হয়েছে। তবে আবাসন সংকট নিরসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা হতাশ।
ছাত্রশিবির প্রতিশ্রুতির নামে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে উল্লেখ করে সপ্তম চাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থী সাজ্জাদ হোসেন হৃদয় বলেন, তারা ২৮ হাজার শিক্ষার্থীর আবাসন সংকট নিরসন, উপজেলাভিত্তিক বাস চালু ও মেডিকেল সেন্টারকে পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল করার ইশতেহার বাস্তবায়ন করেনি। নারী শিক্ষার্থীদের হয়রানি ও নির্যাতনের ঘটনায় দৃশ্যমান শাস্তি নিশ্চিত করতে পারেনি। তারা মূলত চাকসুর মাধ্যমে তাদের মাদার পার্টিকে সার্ভ করেছে।
শাখা ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি রোমান রহমান বলেন, চাকসুর সদ্য সাবেক কমিটি চাকসু নির্বাচন একাডেমিক ক্যালেন্ডারভুক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে। তবে চাকসুকে আমি আংশিক সফল বলব। তারা এক বছর সময়ের মধ্যে কিছু কাজ করেছে।
চাকসুর সাঈদ বিন হাবীব বলেন, আমরা আমাদের ইশতেহারের সব বিষয় নিয়ে কাজ করেছি। কিছু কাজ হয়তো ছয় মাস কিংবা এক বছর পর দৃশ্যমান হবে। আমরা ইশতেহারের বাইরে গিয়ে কয়েকটি হলের রিডিংরুমে এসিও স্থাপন করেছি। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়া বাজেটের বাইরেও স্পন্সর ম্যানেজ করে এবং ব্যক্তি উদ্যোগে এসব কাজ সম্পন্ন করেছি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

