মেয়র-কাউন্সিলর হতে মাঠে বিএনপির তিন শতাধিক নেতা-নেত্রী

এম কে মনির, চট্টগ্রাম

মেয়র-কাউন্সিলর হতে মাঠে বিএনপির তিন শতাধিক নেতা-নেত্রী

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের (চসিক) এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো ঘোষণা নেই। জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী কাউন্সিলরবিহীন চলছে নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডের নাগরিক সেবা কার্যক্রম। ভোটের এই অনিশ্চিত আবহের মধ্যেই বন্দরনগরীতে বইছে আগাম নির্বাচনি হাওয়া।

যেকোনো সময় নির্বাচনের ঘোষণা আসতে পারে—এমন সম্ভাবনায় আগেভাগেই মাঠে নেমেছেন ক্ষমতাসীন দল বিএনপির একঝাঁক নেতা। এর মধ্যে অন্তত এক ডজন মহানগর কমিটির নেতা ভোটের মাঠ গোছাচ্ছেন। অন্যরা মহানগর ও ওয়ার্ড কমিটির সাবেক নেতা। এছাড়া রয়েছেন সাবেক কাউন্সিলর, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের নেতারাও। সব মিলিয়ে দলটির অন্তত সাড়ে ৩০০ নেতা-নেত্রী ইতোমধ্যে নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছেন।

বিজ্ঞাপন

একই সঙ্গে চলতি বছরের এপ্রিল থেকেই একক প্রার্থী নিয়ে মাঠে নেমেছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা। প্রথমবারের মতো সংরক্ষিত নারী ওয়ার্ডেও প্রার্থী দেবে দলটি। তবে মেয়র প্রার্থী ও কাউন্সিলরদের একাংশের নাম ঘোষণা করা হলেও বাকিদের নাম আরো যাচাই-বাছাই করছে দলটি।

দলীয় সূত্র ও মাঠপর্যায়ের চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে নগরীর ৪১টি সাধারণ ওয়ার্ড এবং ১৪টি সংরক্ষিত নারী ওয়ার্ডে পুরোদমে সক্রিয় বিএনপি ও জামায়াতের সম্ভাব্য প্রার্থীরা। মেয়র পদেও বিএনপির একাধিক হেভিওয়েট ও তরুণ নেতার নাম আলোচনায় আসছে। ঈদুল আজহার সময়ও ব্যানার, ফেস্টুন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুভেচ্ছা বিনিময় এবং ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে মতবিনিময় সভা, মেজবান, কাপড় বিতরণ, খেলাধূলার মাধ্যমে তারা নিজেদের প্রার্থিতা জানান দিয়েছেন। কেউ কেউ ওয়াসার পানি, ময়লা ব্যবস্থাপনা, জলাবদ্ধতা, ড্রেন, কালভার্ট, কবরস্থান, খেলার মাঠ নিমার্ণের মতো স্থানীয় উন্নয়ন ও জনদুর্ভোগগুলো সমাধানে গুরুত্ব দিচ্ছেন।

বিএনপির তৃণমূলের কর্মীরা বলছেন, বিগত নির্বাচনগুলোয় ফ্যাসিবাদী সরকারের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে অনেকেই মাঠে নামতে পারেননি। আওয়ামী লীগ একতরফাভাবে ভোটারবিহীন নির্বাচনে মেয়র, কাউন্সিলর পদে ক্ষমতায় বসে। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। পদ-পদবিতে থাকা নেতা থেকে শুরু করে সাবেক ও বর্তমান অনেক নেতাও ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে নিজেদের বলয় ভারী করছেন।

নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডে বিএনপিতে পাঁচ থেকে ১২ জন পর্যন্ত নেতা কাউন্সিলর প্রার্থী হতে চাইছেন। প্রত্যেক ওয়ার্ডে একাধিক নারী নেত্রীও সক্রিয়। তবে মেয়র পদে এখন পর্যন্ত দুই হেভিওয়েট প্রার্থী মাঠে সক্রিয় আছেন। এদের একজন হলেন নগর বিএনপির সাবেক সভাপতি ও বর্তমান সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। অন্যজন নগর বিএনপির বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাজিমুর রহমান। এর বাইরে একাধিক প্রার্থীর নাম শোনা গেলেও মাঠে সক্রিয় আছেন এই দুই নেতা। তবে প্রচারে সিটি মেয়র ডা. শাহাদাৎ হোসেন এগিয়ে আছেন বলে জানা গেছে ।

২০২১ সালে অনুষ্ঠিত চসিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগের রেজাউল করিমকে বিজয়ী ঘোষণা করা হলে ফলাফল কারচুপির অভিযোগ এনে আদালতে মামলা করেন বিএনপির প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেন। ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর আদালতের রায়ে তাকে মেয়র ঘোষণা করা হয়। সেই থেকে কোনো কাউন্সিলর ছাড়াই তিনি নগরীর কার্যক্রম চালিয়ে নিচ্ছেন।

শাহাদাত হোসেন বলেন, আদালতের রায়ে মেয়র হলেও জনপ্রিয়তা যাচাই করতে তিনি নির্বাচন চান। নির্বাচনের মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ পরিষদ চসিককে আরো গতিশীল করবে। এর মধ্যে তিনি নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

নগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান মেয়র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়ে বলেন, দল যদি চায় আমি চসিক নির্বাচনে মেয়র পদে লড়ব। দলের সিদ্ধান্ত আমি সব সময় মেনে নিয়েছি, ভবিষ্যতেও এর ব্যত্যয় ঘটবে না। নিজে চসিক নির্বাচনে মেয়র পদে লড়ার প্রত্যয় জানিয়ে সম্ভাব্য কাউন্সিলরদের মনোনয়ন নিয়েও কথা বলেন নাজিমুর রহমান।

তিনি জানান, কাউন্সিলর প্রার্থী চূড়ান্ত করতে আমরা মহানগর কমিটি প্রাথমিকভাবে আলাপ-আলোচনা করছি। তবে এখনো কিছু চূড়ান্ত হয়নি। নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হলে আমরা যথাসময়ে এগুলো সম্পন্ন করব।

এদিকে, নির্বাচনের দিনক্ষণ কিংবা দলীয়ভাবে প্রার্থী চূড়ান্ত না করলেও মাঠে সক্রিয় স্বঘোষিত কাউন্সিলর প্রার্থীরা। নগরীর ৩ নম্বর পাঁচলাইশ ওয়ার্ডে ৯ জন বিএনপি নেতা কাউন্সিলর হতে চান। এর মধ্যে আলোচনায় রয়েছেনÑমহানগর বিএনপির সাবেক দপ্তর সম্পাদক ইদ্রিস আলী, সাবেক কাউন্সিলর শফিকুল ইসলাম, মহানগর বিএনপি নেতা জিএম আইয়ুব খানসহ কয়েকজন।

১০ নম্বর উত্তর কাট্টলী ওয়ার্ডে মহানগর যুবদলের সহসভাপতি সাহেদ আকবর, ওয়ার্ড বিএনপির আহ্বায়ক রফিক উদ্দিন ও সদস্য শামসুল আলম কাউন্সিলর প্রার্থী হতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। তারা বিভিন্ন জনদুর্ভোগ লাঘবে ভূমিকা রেখে এলাকাবাসীর নজরে আসার চেষ্টা করছেন। পার্শ্ববর্তী ৯ নম্বর উত্তর পাহাড়তলী ওয়ার্ডে মহানগর যুবদল নেতা শাহরিয়ার জিয়া, স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা জহিরুল হক টুটুল ও বিএনপি নেতা মো. সেলিম প্রার্থী হওয়ার কথা জানান দিয়ে তৎপর রয়েছেন।

৭ নম্বর পশ্চিম ষোলশহর ওয়ার্ডে আট বিএনপি নেতা কাউন্সিলর হতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। এদের মধ্য আরইউ চৌধুরী শাহীন, ইস্কান্দর মির্জা, ছাত্রদলের সাবেক নেতা সাইফুল ইসলাম সাইফ, মনির চৌধুরী, মনজুরুল ইসলাম মনজুর নাম আলোচনায় রয়েছে। একই ভাবে বিএনপিতে প্রায় সবকটি ওয়ার্ডে পাঁচ থেকে ১২ নেতা প্রার্থিতার জানান দিচ্ছেন।

এদিকে, গত সংসদ নির্বাচনের মতো আগেভাগেই মাঠ গোছাতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীও। ইতোমধ্যে দলটির চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক শামসুজ্জামান হেলালীকে মেয়র পদে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে।

নগরীর কয়েকটি ওয়ার্ড ছাড়া বেশিরভাগ ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থীও চূড়ান্ত করেছে দলটি। এর মধ্যে পাঁচলাইশে ইসমাঈল হোসেন সিরাজী, চান্দগাঁওয়ে রইসুর রহমান তিতু, পশ্চিম ষোলশহরে আনিসুর রহমান চৌধুরী, শুলকবহরে মাহবুবুর রহমান রুমী, উত্তর পাহাড়তলীতে ইউসুফ চৌধুরী, উত্তর কাট্টলীতে ডা. শাহাদাৎ হোসেন, দক্ষিণ পাহাড়তলীতে মাহফুজুল আলম, বাগমনিরামে সুলতান সালাউদ্দিন রাফি, চকবাজারে মো. ইলিয়াছ। অন্য ওয়ার্ডগুলোয় একাধিক নেতার নাম প্রস্তাবে আসায় আরো যাচাই-বাছাই করছে দলটি। ফলে এখনো চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হয়নি।

এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ শাহজাহান বলেন, আমরা মেয়র পদে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করলেও এখনো কাউন্সিলরদের নাম ঘোষণা করিনি। এবার নারী কাউন্সিলর পদেও প্রার্থী দেওয়া হবে। নির্বাচনের জন্য যথেষ্ট প্রস্তুতি রয়েছে জামায়াতের। যেকোনো মুহূর্তে নির্বাচন হলে দলটির নেতারা প্রস্তুত বলেও জানান তিনি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন