আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

‎সেতু নয় যেন ‘মরণফাঁদ’, আতঙ্কে পাড়ি দিচ্ছেন হাজারো মানুষ

উপজেলা প্রতিনিধি, (দাউদকান্দি) কুমিল্লা

‎সেতু নয় যেন ‘মরণফাঁদ’, আতঙ্কে পাড়ি দিচ্ছেন হাজারো মানুষ

কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার গোয়ালমারী ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের জুরানপুর গ্রামে একটি সেতু এখন এলাকাবাসীর কাছে আতঙ্কের প্রতীক হয়ে উঠেছে। ঝাউতলী চৌরাস্তা মোড় থেকে পাঁচগাছিয়া সড়কের ওপর অবস্থিত প্রায় তিন দশক আগে নির্মিত এই সেতুটির মাঝখানের অংশ ভেঙে গেছে অনেক আগেই। তবুও প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই সেতু পার হচ্ছেন।

বিজ্ঞাপন

‎সরেজমিনে দেখা যায়, সেতুর ভাঙা অংশে বস্তার মধ্যে বালি ভরে অস্থায়ীভাবে ঢেকে রাখা হয়েছে। দূর থেকে দেখে ভাঙা অংশ বোঝার উপায় নেই। ফলে নতুন চালক বা বাইরের লোকজন বুঝতে না পেরে প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন। এছাড়াও সেতুর দু'পাশের নিরাপদ বেষ্টনী দেয়ালও প্রায় ভেঙে বিলীন হয়ে গেছে। ফলে সেতু থেকে গাড়ি ছিটকে পরার আশঙ্কা রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষায়, এটি এখন আর সেতু নয়-যেন এক নীরব মরণফাঁদ।

‎গোয়ালমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান প্রধান জানান, বহু বছর আগে নির্মিত সেতুটির মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। স্থানীয়দের সহযোগিতায় তিনি পাঁচ-ছয়বার অস্থায়ীভাবে মেরামত করেছেন।

কিন্তু স্থায়ী সমাধানের জন্য বারবার উপজেলা কর্তৃপক্ষের দ্বারস্থ হলেও এখনো কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। তাঁর ভাষায়, “ইঞ্জিনিয়াররা এসে দেখে যান, আশ্বাস দেন। কিন্তু বাস্তবে কাজের অগ্রগতি আমরা দেখতে পাইনি।”

‎সেতুর পাশেই বসবাস করেন জয়নব বিবি। প্রতিদিনের দুর্ঘটনার দৃশ্য তাঁর কাছে নতুন কিছু নয়। কিছুদিন আগে একটি অটোরিকশা ভাঙা অংশে পড়ে গেলে কয়েকজন যাত্রী আহত হন। ঘটনাটি স্মরণ করে তিনি বলেন, “যাত্রীদের চিৎকার শুনে আমরা ঘর থেকে ছুটে যাই। বরফ এনে ব্যথা কমানোর চেষ্টা করি, মাথায় পানি দিই। সবাই তখন খুব আতঙ্কে ছিল।”

‎এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা ৭২ বছর বয়সী তোতা মিয়া জানান, এই অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল। ধান, ভুট্টা, গম, আলুসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদন করেন তাঁরা। কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ সেতুর কারণে বড় ট্রাক বা পণ্যবাহী যানবাহন চলাচল করতে চায় না। এতে কৃষকেরা উৎপাদিত ফসল সহজে বাজারে নিতে পারেন না এবং ন্যায্যমূল্য থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন। তাঁর মতে, “গাড়ি না এলে ফসল বাজারে নেওয়া যায় না। অনেকেই তাই এখন কৃষিকাজে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন।”

‎জরুরি মুহূর্তেও এই সেতু মানুষের জন্য বড় ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, অসুস্থ রোগী বা গর্ভবতী নারীকে হাসপাতালে নিতে গিয়েও বিপাকে পড়তে হয়। অনেক সময় অ্যাম্বুলেন্স চালকেরাও ঝুঁকি নিয়ে সেতু পার হতে অনীহা প্রকাশ করেন।

‎এই সড়কের আশপাশে রয়েছে কলেজ, উচ্চবিদ্যালয়, প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মহিলা মাদ্রাসাসহ বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। প্রতিদিন অসংখ্য শিক্ষার্থী এই পথ দিয়ে যাতায়াত করে। ভাঙা সেতু পার হওয়ার সময় তাদের মধ্যেও ভীতি কাজ করে।

‎অটোরিকশা চালক সুমন মিয়া বলেন, “আমরা অনেক সময় যাত্রীদের নামিয়ে দিয়ে সেতু পার হই। দূর থেকে বোঝা যায় না যে মাঝখানে ভাঙা। যারা নতুন চালক, তারা বুঝতে না পেরে দুর্ঘটনায় পড়েন।”

‎স্থানীয় বাসিন্দা হেকমত আলী, সুমন ভুঁইয়া ও মোশারফ হোসেন জানান, এটি একটি ব্যস্ত সড়ক। পাঁচগাছিয়া, তুলাতলী, বাজারখোলা, হাউসদি, পালের বাজার, নলচক ও নায়েরগাঁওসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকার মানুষ প্রতিদিন এই পথ ব্যবহার করেন। এমনকি পাশের জেলা চাঁদপুরের মতলব এলাকায় যাতায়াতের ক্ষেত্রেও অনেকের এই সেতুর ওপর নির্ভর করতে হয়। উপজেলা সদর বা ঢাকায় যাওয়ার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ।

‎স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।

‎এ বিষয়ে দাউদকান্দি উপজেলা প্রকৌশলী মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, সেতুটিকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের জন্য প্রস্তাব পাঠানো হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন