দুই হাত নেই, তবু থেমে নেই স্বপ্ন। যে বয়সে সহপাঠীদের সঙ্গে খেলাধুলা আর বই-খাতা নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা, সেই বয়সেই বিদ্যুতের ভয়াবহ স্পর্শ কেড়ে নিয়েছিল তার দুটি হাত। মুহূর্তে বদলে যায় জীবনের চেনা ছন্দ। কিন্তু শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থামাতে পারেনি তার পড়াশোনার অদম্য আগ্রহ।
প্রথমে মুখ দিয়ে, পরে পায়ের আঙুলের ফাঁকে কলম আটকে লেখার অনুশীলন শুরু করেন তিনি। দীর্ঘ সাধনা, অধ্যবসায় আর অসীম মনোবলে পায়ের আঙুলে লিখেই বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি ও এইচএসসি—উভয় পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন।
সীতাকুণ্ডের তরুণ মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম রাব্বির এখন মূল স্বপ্ন বিজ্ঞানী হওয়া। তবে দিনমজুর বাবার সীমিত আয়ে উচ্চশিক্ষার ব্যয় বহন করা অত্যন্ত কঠিন। এমন পরিস্থিতিতে তার পাশে দাঁড়িয়েছেন বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক যুগ্ম মহাসচিব অধ্যাপক লায়ন আসলাম চৌধুরী এফসিএ। তিনি রাব্বির উচ্চশিক্ষায় সহযোগিতার ঘোষণা দিয়েছেন। পাশাপাশি উপজেলা প্রশাসন থেকেও আবাসন, কর্মসংস্থান ও পড়াশোনায় সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী ইউনিয়নের পূর্ব হাসনাবাদ গ্রামের দিনমজুর বজলুর রহমান ও রোজি আক্তার দম্পতির বড় ছেলে রাব্বি। ২০১৬ সালের ৫ অক্টোবর স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে ভাটিয়ারী ফুটওভারব্রিজ এলাকায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে গুরুতর আহত হন তিনি। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দীর্ঘ চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের পর প্রাণে বাঁচলেও হারাতে হয় দুটি হাত। তখন তিনি পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন। জীবনের এমন কঠিন বাস্তবতার মুখেও তিনি পড়াশোনা ছাড়েননি। প্রথমে মুখ দিয়ে কলম লেখার চেষ্টা করলেও পরে দীর্ঘ অনুশীলনে পায়ের আঙুলের ফাঁকে কলম আটকে লেখার কৌশল আয়ত্ত করেন।
প্রাথমিক সমাপনীতে ভালো ফলাফলের পর ২০২৪ সালে ভাটিয়ারীর হাজী তোবারক আলী উচ্চবিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসিতে জিপিএ-৫ অর্জন করেন। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম সরকারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে আবারও জিপিএ-৫ পান।
রাব্বির এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে অদম্য ইচ্ছাশক্তির পাশাপাশি পরিবারের সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার নিরন্তর সংগ্রাম। এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়ার পর বিভিন্ন মহল থেকে সহযোগিতার আশ্বাস মিললেও তারা প্রত্যাশিত সহায়তা পাননি। তবে এইচএসসিতেও জিপিএ-৫ অর্জনের পর বিষয়টি নতুন করে সবার নজর কাড়ে।
১ নভেম্বর সন্ধ্যায় সীতাকুণ্ডে নিজের বাসভবনে রাব্বি ও তার বাবাকে সংবর্ধনা দিয়ে নগদ অর্থসহায়তা দেন অধ্যাপক লায়ন আসলাম চৌধুরী এফসিএ। পরদিন ২ নভেম্বর সকালে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম নিজ কার্যালয়ে রাব্বিকে ফুলেল শুভেচ্ছা, সম্মাননা স্মারক ও আর্থিক সহায়তার চেক দিয়ে সংবর্ধিত করেন। এ সময় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে খাসজমিতে ঘর নির্মাণ, বাবার কর্মসংস্থানের জন্য মুদি দোকান এবং রাব্বির উচ্চশিক্ষায় সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়।
রাব্বির সামনে এখন সবচেয়ে বড় লক্ষ্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে বিজ্ঞান বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা। ভবিষ্যতে বিজ্ঞানী হওয়ার পাশাপাশি সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়ে পরিবারের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে চান তিনি। দুই হাত হারানোর পরও পায়ের আঙুলে কলম ধরে দুটি পাবলিক পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করা রাব্বির এই সাফল্য কেবল তার ব্যক্তিগত অর্জন নয়, এটি প্রতিকূলতার কাছে হার না মানার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এখন প্রয়োজন তার মেধার যথাযথ মূল্যায়ন, উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা এবং প্রতিশ্রুত সহযোগিতাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


