এবারো কোরবানির পশুর চামড়া কিনে বড় ধরনের লোকশানে পড়েছেন মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ীরা। বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা থেকে কিনে এনে আড়তদারদের কাছে বিক্রি করেন এই একদিনের ব্যবসায়ীরা। তাদের অভিযোগ আতুরার ডিপো স্থায়ী কাঁচা চামড়ার বাজার ও চৌমুহনির অস্থায়ী বাজারের আড়তদাররা কেউ সরকার নির্ধারিত দামের আশপাশেও চামড়া কিনছেন না।
সিন্ডিকেট করে নামমাত্র টাকায় চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য করছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীদের। আর এই কারণে বড় ধরনের লোকশানের মুখে পড়তে হয়েছে তাদের। পাড়া-মহল্লায় ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকায় কিনে আনা বড় ধরনের গরুর চামড়া আড়তে এসে ১৫০ টাকায়ও বিক্রি করতে পারছেন না তারা।
আতুরার ডিপো ও চৌমুহনি কাঁচা চামড়ার বাজার ঘুরে দেখা গেছে বিভিন্ন উপজেলা থেকে ট্রাক, পিকআপ ও ভ্যানে করে আসছে গরুর চামড়া। মৌসুমি ব্যবসায়ীরা ছাড়াও বিভিন্ন মাদরাসা ও এতিমখানা কর্তৃপক্ষ এসব চামড়া পাড়া-মহল্লা থেকে সংগ্রহ করে বাজারে নিয়ে এসেছেন বিক্রি করতে। আড়তগুলোতে চলছে কাঁচা চামড়া লবণ দেওয়ার কাজ। কেউ ব্যস্ত রয়েছেন চামড়া ড্রেসিংয়ে।
তবে আড়তের ব্যস্ততার মাঝেও মৌসুমি ব্যবসায়ীদের মুখে হাসি নেই। বরাবরের মতো এবারও দাম না পাওয়ার অভিযোগ তাদের। আতুরার ডিপো এলাকার কাঁচা চামড়ার আড়ত ঘুরে দেখা যায়, ছোট আকারের একটি গরুর চামড়া বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১২০ থেকে ১৫০ টাকায়। মাঝারি আকারের চামড়ার দাম ২০০ আর বড় গরুর চামড়া বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ২৫০ টাকায়।
অথচ গ্রামের হাট কিংবা বাসা-বাড়ি থেকে এসব চামড়া সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ীকে বড় চামড়ার জন্য ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হয়েছে। অথচ সরকার নির্ধারিত প্রতি বর্গফুট দাম হিসাব করলে লবণ ছাড়াই বড় গরুর চামড়াটির দাম এক হাজার টাকার কাছাকাছি হওয়ার কথা বলে জানান মৌসুমী ব্যবসায়ীরা।
সাধারণত ১২ থেকে ১৬ বর্গফুটের চামড়াকে ছোট আকার হিসেবে ধরা হয়। ১৭ থেকে ২২ বর্গফুট মাঝারি এবং ২৩ বর্গফুটের বেশি হলে সেটিকে বড় চামড়া হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সাইজ অনুযায়ী দাম বাড়ার কথা থাকলেও বাস্তবে সেই সুবিধা মিলছে না বলে অভিযোগ মৌসুমি ব্যবসায়ীদের।
আতুরার ডিপোতে চামড়া বাজারে চামড়া নিয়ে আসে আসা মৌসুমি ব্যবসায়ী ইসহাক মিয়া জানান, ভাটিয়ারি থেকে বড় চামড়া ৩৫০ টাকা পিচ হিসেবে কিনে এনেছেন তিনি। গাড়ি ভাড়া, শ্রমিক খরচ আলাদা যোগ করে প্রতি পিচ চামড়ায় তার খরচ পড়েছে ৪০০ টাকার ওপরে। বেলা ৩ টায় আতুড়ার ডিপোতে এসেছেন। আড়তপাড়ার রাস্তার পাশে চামড়া নিয়ে বলে আছেন। বিকেল ৫টা পর্যন্ত কোনো ক্রেতা আসেনি। সাড়ে ৫টার পর ২ জন ক্রেতা এসেছেন কিন্তু প্রতি পিস চামড়ার দাম ১৬০ থেকে ১৭০ টাকার বেশি কেউ বলেনি।
সন্ধ্যা লাগতে চলল আর কিছু সময় পর চামড়ার গুনগত মান নষ্ট হতে শুরু করবে। এ সময় এই দামও বলবেন না কেউ। বাধ্য হয়েই হয়তো লোকশানে চামড়া বিক্রি করতে হবে বলে জানান তিনি। এই বাজারে বড়দিঘিপাড় থেকে চামড়া নিয়ে এসেছেন মোহাম্মদ সোলাইমান। তিনি জানান, বাজারের চামড়া ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে বসে আছেন।
দুপুর থেকেই মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চামড়া নিয়ে এলেও সন্ধ্যা পর্যন্ত আড়তদারদের প্রতিনিধিরা বাজারে আসেনি। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা যখন হতাশ হতে শুরু করেছেন ঠিক তখন সন্ধ্যার আগে নামমাত্র টাকায় চামড়া কেনার সুযোগ নিতে বসে আছেন সবাই।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাজার মনিটরিং করার কথা বলা হলেও বাস্তবে তা নেই বলে অভিযোগ সোলাইমানের। একই চিত্র দেখা গেছে চৌমুহনি ও বহদ্দারহাট অস্থায়ী চামড়া বাজারের। চামড়া নিয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও ক্রেতাদের দেখা পাননি মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। বাধ্য হয়ে অনেকে নামমাত্র টাকায় চামড়া বিক্রি করে বাজার ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।
তবে বাজারে সিন্ডিকেট করার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কাঁচা চামড়ার আড়তদার সমিতির সভাপতি মুসলিম উদ্দিন। তিনি জানান, চামড়া কিনে পরিষ্কার করে লবণ দিতে হয়। সব মিলিয়ে একটি লবণযুক্ত চামড়া কারখানা পর্যন্ত পৌঁছাতে খরচ পড়ে কমবেশি ৪৫০ টাকা। সরকার যে দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে সেই দাম থেকে এই খরচের টাকা বাদ দিতে হবে। কিন্তু মৌসুমী ব্যবসায়ীরা এই হিসেবে না বুঝেই বেশি দামে চামড়া কিনে এনেছেন। এই কারণেই কেউ কেউ লোকশানে পড়ছেন।
কাঙ্খিত দামে চামড়া বিক্রি করতে না পেরে গত বছরও বিপুল পরিমাণ চামড়া রাস্তায় ফেলে বাজার ছাড়েন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। ঈদের পর দিন সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা বিভিন্ন এলাকায় ফেলে যাওয়া চামড়া ডাম্পিং করে।
এই বিষয়টি মাথায় রেখে এ বছর ইসলামি সমাজ কল্যাণ পরিষদ ও গাউসিয়া কমিটি নামের দুটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা থেকে নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবকদের দিয়ে চামড়া সংগ্রহ করে লবণ দেওয়ার কাজ শুরু করেছে। গাউছিয়া কমিটি ১ লাখ আর ইসলামী সমাজ কল্যাণ পরিষদ ৩০ হাজার পিস চামড়া লবণজাত করার উদ্যোগ নিয়েছে।
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


কোরবানির চামড়া ব্যবস্থাপনা দেখতে আমিনবাজারে বাণিজ্যমন্ত্রী
বগুড়ায় চামড়ার বাজারে ধস, বিপাকে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা