পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা স্বচ্ছ জলের ধারা। চারপাশে গভীর বন, খাড়া পাহাড় আর পাথুরে পথ। কোথাও ঝিরির শব্দ, কোথাও নিস্তব্ধতার রাজত্ব। এমনই এক দুর্গম পাহাড়ি জনপদে লুকিয়ে আছে আলীকদম উপজেলার বুনো ঝর্ণা সাইংপ্রা।
বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার পূর্ব দিগন্তে চিম্বুক রেঞ্জের কির্সতং পাহাড়ের কাছে এই ঝর্ণার অবস্থান। পর্যটকদের পরিচিত অনেক ঝর্ণার মতো সাইংপ্রা সহজে পৌঁছানো যায় এমন কোনো পর্যটনকেন্দ্র নয়। এটি মূলত একটি অফ-রুটের বুনো ঝর্ণা। দুর্গম পাহাড়ি ট্রেইল পেরিয়ে তবেই মিলবে এর দেখা।
সাইংপ্রা ঝর্ণায় মোটামুটি চার থেকে পাঁচটি ধাপ রয়েছে। প্রতিটি ধাপেরই রয়েছে আলাদা সৌন্দর্য। কির্সতং ও রংরাং পাহাড় সামিট করতে যাওয়া অনেক ট্রেকার তাঁদের ভ্রমণ পরিকল্পনায় সাইংপ্রা ঝর্ণাকেও যুক্ত করেন। কারণ, ঝর্ণাটির সৌন্দর্যের পাশাপাশি এর পথে রয়েছে পাহাড়কে কাছ থেকে অনুভব করার অন্যরকম অভিজ্ঞতা।
আলীকদমের মেনিয়াংক পাড়া থেকে রংরাং ও কির্সতং সামিটের পর খেমচং পাড়া হয়ে সাইংপ্রা ঝর্ণার পথে যেতে হয়। পথটি যেমন দুর্গম, তেমনি মনোমুগ্ধকর। ট্রেইনের শুরুতেই খাড়া পাহাড় বেয়ে নিচে নামতে হয়।
-7c2a95.jpg)
এরপর শুরু হয় সাইংপ্রার মূল ট্রেইল। বড় বড় বোল্ডারে ভরা পিচ্ছিল পথ। বর্ষায় এই পথ আরও কঠিন হয়ে ওঠে। পাথরের ওপর পা রেখে চলাই অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। কোথাও পা পিছলে যাওয়ার আশঙ্কা, কোথাও পাথর আঁকড়ে এগিয়ে চলা। একপর্যায়ে নিচের দিকে নামার পথ শেষ হয়ে শুরু হয় ওপরে ওঠা। পাথুরে পথ ধরে উঠতে উঠতে একসময় চোখের সামনে দেখা দেয় সাইংপ্রা ঝর্ণা। দীর্ঘ ও কষ্টসাধ্য ট্রেকিংয়ের পর ঝর্ণাটির দেখা পাওয়ার মুহূর্তটিই হয়ে ওঠে অভিযাত্রার বড় প্রাপ্তি।
যেভাবে যেতে হয়
সাইংপ্রা ঝর্ণায় যেতে হলে দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে আলীকদমে পৌঁছাতে হবে। আলীকদমে পৌঁছে স্থানীয় গাইড ঠিক করা প্রয়োজন। দুর্গম পাহাড়ি পথ হওয়ায় স্থানীয় গাইড ছাড়া এই ট্রেকিংয়ে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। গাইডের নির্দিষ্ট কোনো ফি নেই; স্থানীয়ভাবে আলোচনা করে পারিশ্রমিক ঠিক করতে হয়। আলীকদমের আমতলী ঘাট থেকে তৈনখালের উজানে নৌকাযোগে দুছরী বাজারে যাওয়া যায়।
দুছরী বাজার থেকে শুরু হবে হাঁটা পথ। ট্রেকিং করে যেতে হবে মেনকিউ পাড়া, সেখান থেকে মেনিয়াংক পাড়া। এই পাড়া থেকে প্রায় দেড় ঘণ্টা হাঁটলে রুংরাং পাহাড়। এরপর খেমচং পাড়া। আর খেমচং পাড়া থেকেই শুরু হয় সাইংপ্রা ঝর্ণার মূল ট্রেক।
থাকার ব্যবস্থা
এই দুর্গম এলাকায় পর্যটনকেন্দ্রিক হোটেল বা রিসোর্টের ব্যবস্থা নেই। রাতে থাকতে হলে স্থানীয় ম্রো পাড়ার কারবারীর সঙ্গে আগে কথা বলতে হয়। পাড়ার কারবারী অতিথিদের থাকার ব্যবস্থা করে দেন।
আলীকদম ট্যুর গাইড অ্যাসোসিয়শনের সবাপতি মিন্টু দে বলেন, সাইংপ্রার ট্রেকিং সহজ নয়। প্রতিদিন আট থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত পাহাড়ি পথে হাঁটতে হতে পারে। রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে দীর্ঘ সময় ব্যাকপ্যাক বহন করতে হয়। কোনো কোনো পরিস্থিতিতে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি সময় লাগতে পারে। তাই পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়া এই পথে যাওয়া ঠিক নয়।
শুকনা খাবার, ট্রেকিং ব্যাগ, বর্ষাকালে রেইন কভার বা পলিথিন, ট্রেকিং প্যান্ট, উপযোগী ট্রেকিং স্যান্ডেল বা জুতা, পানির বোতল, শুকনা খাবার, হেডল্যাম্প, গামছা, মশা প্রতিরোধের উপকরণ, স্যালাইন ও গ্লুকোজ সঙ্গে রাখা ভালো। পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র বা শিক্ষার্থী পরিচয়পত্রের ফটোকপিও সঙ্গে রাখার পরামর্শ দেন তিনি।
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

