জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার বাহাদুরাবাদ ও গাইবান্ধা বালাসী ফেরিঘাট টার্মিনাল প্রায় ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ফেরিঘাট টার্মিনাল বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) অপরিকল্পিত ড্রেজিং ও নাব্য সংকটের কারণে প্রায় পাঁচ বছর ধরে কার্যত অচল অবস্থায় পড়ে আছে। ফেরি চলাচলের জন্য নির্মিত টার্মিনাল দুটো কাজে না আসায় জরাজীর্ণ ও চারদিকে ঝুপঝাড়ে পরিণত হয়েছে ফলে নষ্ট হচ্ছে নির্মাণাধীন ভবন ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। জনগণের বহুল প্রত্যাশিত এই প্রকল্পটি চালু না হওয়ায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ইঞ্জিন চালিত নৌকায় প্রায় ২৬ কিলোমিটার যমুনা নদীপথ পারাপার নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে চরম হতাশা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, তৎকালীন আওয়ামী সরকার আমলে প্রথমে ১২৪ কোটি ৭৭ লাখ টাকা বরাদ্দ হয় পরে দুই দফায় প্রকল্পের অর্থ বাড়িয়ে প্রায় ১৪৪ কোটি ২৭ লাখ টাকা ব্যয়ে যমুনা নদীর বালাসী-বাহাদুরাবাদ নৌরুটে ফেরি চলাচল চালুর লক্ষ্যে টার্মিনাল নির্মাণ করা হয়।
প্রকল্পের আওতায় দুই ঘাটে ফেরি টার্মিনাল, পার্কিং, অভ্যন্তরীণ সড়ক, টোল আদায় বুথ, পুলিশ ও আনসার ব্যারাকসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়। প্রকল্পটির কাজ ২০১৭ সালে হাতে নিয়ে ২০১৮ সালে কাজ শুরু করে শেষ হয় ২০২১ সালে পরবর্তীতে প্রকল্পটি উদ্বোধন হয় ২০২২ সালের ৯ এপ্রিল কিন্তু দীর্ঘ পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও এই রুটে নিয়মিত ফেরি চলাচল শুরু করা সম্ভব হয়নি।
বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানা গেছে, নাব্য সংকট, অপরিকল্পিত ড্রেজিং এবং পর্যাপ্ত সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়া প্রকল্প গ্রহণের কারণে পুরো উদ্যোগটি ব্যর্থ হয়ে পড়ে। এমনকি পরীক্ষামূলকভাবে কয়েক দফা ফেরি চালানোর চেষ্টা করেও সফলতা পাওয়া যায়নি। পরে ২০২২ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে লঞ্চ সার্ভিস চালু করা হলেও তা উদ্বোধনের কয়েকদিনের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যায়। ফলে প্রায় ১৪৫ কোটি টাকার এই প্রকল্প কার্যত অচল হয়ে পড়ে।
এদিকে (বিআইডব্লিউটিএ)এর সংশ্লিষ্ট একটি কারিগরি কমিটি নাব্যতা সংকটসহ আরও কিছু ক্রটি দেখিয়ে ইতিমধ্যে এই নৌরুটকে ফেরি চলাচলের অনুপযোগী ঘোষণা করে টার্মিনালগুলো অন্য কাজে ব্যবহারের সুপারিশ করেছেন।
স্থানীয়দের দাবি, এ ফেরিঘাট টার্মিনাল কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই আওয়ামী লীগ সরকার থাকাকালীন মেগা প্রকল্প হাতে নিয়ে দেশের কোটি কোটি টাকা লোটপাট করা হয়েছে এখন আর এই টার্মিনাল গুলো কোনো কাজে আসছে না। এখন আমরা সরকারের কাছে বাহাদুরাবাদ থেকে বালাসী পর্যন্ত দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের দাবি জানায়। সেতু নির্মাণ হলে দেশের উত্তর অঞ্চলের প্রায় কোটি মানুষের জামালপুর হয়ে ঢাকায় যাতায়াতসহ ব্যবসা-বাণিজ্যের সুবিধা হবে।
বিআইডব্লিউটিএ বাহাদুরাবাদ-বালাসী- চিলমারী ফেরিঘাট টার্মিনাল সাব স্টেশনের প্রকৌশলী মেহবুব আলম মিঠুন জানান, ‘বালাসী-বাহাদুরাবাদ নৌ-রুটে নাব্য সংকটের কারণে ফেরি চলাচল আর সম্ভব না ফলে উভয় পাশের ফেরিঘাট টার্মিনাল দুটো ড্রেজিং অফিস বা নৌ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র করার কথা চলছে তবে ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষের বা মন্ত্রণালয় থেকে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি।’
বাহাদুরাবাদ-বালাসী রুটে দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের দাবি:
দেশের উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে ঢাকা ও দেশের পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ সহজ করতে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জের বাহাদুরাবাদঘাট থেকে গাইবান্ধার বালাসীঘাটে দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণ এখন সময়ের দাবি। দীর্ঘদিনের নাব্য সংকট ও ফেরি চলাচলের অনিশ্চয়তার কারণে গুরুত্বপূর্ণ এই রুটটি স্থায়ী যোগাযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। অথচ সেতুটি নির্মিত হলে উত্তরাঞ্চলের প্রায় দশটি জেলার সঙ্গে ময়মনসিংহ ও ঢাকার ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে।
সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে বালাসী–বাহাদুরাবাদ রুটটি দ্বিতীয় যমুনা সেতুর সম্ভাব্য করিডরগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনায় রয়েছে। এই সেতু নির্মিত হলে গাইবান্ধা থেকে ঢাকার সড়কপথের দূরত্ব প্রায় ১২০ থেকে ১৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত কমে যাবে। এছাড়া উত্তরাঞ্চলের অন্যান্য জেলার ক্ষেত্রেও স্থানভেদে প্রায় ১৩০ থেকে ১৬০ কিলোমিটার পথ কমে আসবে।
সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাবে রংপুর বিভাগের জেলাগুলো। গাইবান্ধা, রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়ের মানুষকে ঢাকায় যেতে বর্তমানের তুলনামূলক দীর্ঘ পথ ঘুরতে হবে না। কৃষিপণ্য দ্রুত ঢাকার বাজারে পৌঁছানো, যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে সময় ও জ্বালানি সাশ্রয় এবং উত্তরাঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে।
এ ছাড়া রংপুর বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি স্থলবন্দর—লালমনিরহাটের বুড়িমারী, দিনাজপুরের হিলি ও বিরল, পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা এবং কুড়িগ্রামের সোনাহাট স্থলবন্দর দিয়ে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম পরিচালিত হয়। দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মিত হলে এসব স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি পণ্য পরিবহনের দূরত্ব ও সময় কমার পাশাপাশি পরিবহন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। এতে উত্তরাঞ্চলের সীমান্তবাণিজ্য আরও গতিশীল হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
অন্যদিকে, দেওয়ানগঞ্জের বাহাদুরাবাদঘাট ও গাইবান্ধার বালাসীঘাট—উভয় পাশেই রেললাইন রয়েছে। তাই সেতু নির্মাণের সঙ্গে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা সংযুক্ত করা সহজ হবে ফলে উত্তরাঞ্চল থেকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রেলপথে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।
বাহাদুরাবাদঘাট হয়ে ময়মনসিংহ ও ঢাকার সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের সরাসরি যোগাযোগও আরও শক্তিশালী হবে। যমুনার ওপর দ্বিতীয় একটি সেতু নির্মিত হলে প্রথম যমুনা সেতু (যমুনা বহুমুখী সেতু)-এর ওপর যানবাহনের চাপও কমবে।
এদিকে স্থানীয়রাও বাহাদুরাবাদ-বালাসী রুটে দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের জোর দাবি জানিয়ে দফায় দফায় মানববন্ধন করে আসছেন।
তাই বাহাদুরাবাদ–বালাসী সেতু শুধু একটি নদী পারাপারের অবকাঠামো নয়, এটি উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা, কৃষি, শিল্প-বাণিজ্য, স্থলবন্দরকেন্দ্রিক আমদানি-রপ্তানি এবং সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। উত্তরাঞ্চলের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ সংকট নিরসনে দ্রুত এ রুটে দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এবং জামালপুর-১ আসনের এমপি এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অপরিকল্পিত ফেরিঘাট টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প হাতে নিয়ে কোটি কোটি টাকা খরচ করে জনগণের প্রত্যাশা নস্যাৎ করা হয়েছে। প্রায় ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে এই ফেরিঘাট টার্মিনাল জনগণের কোনো কাজে আসছে না। আমরা এখন স্থায়ীভাবে বাহাদুরাবাদ-বালাসী রুটে দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা করতেছি, সরকারিভাবে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা চলছে, আশা করি সেতু নির্মাণ হলে রাজধানী ঢাকা, ময়মনসিংহ, জামালপুর সহ সারা দেশের সঙ্গে উত্তর অঞ্চলের প্রায় দশটি জেলার মানুষের ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগ মাধ্যম তরান্বিত হবে।’
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

