ভারতীয় মিশনকর্মীর মৃত্যুর পর অস্বাভাবিক তৎপরতা, প্রশ্নের মুখে হাইকমিশনের ভূমিকা

চট্টগ্রাম ব্যুরো

ভারতীয় মিশনকর্মীর মৃত্যুর পর অস্বাভাবিক তৎপরতা, প্রশ্নের মুখে হাইকমিশনের ভূমিকা
নীল টি-শার্ট পরিহিত ব্যক্তি ভারতীয় কর্মকর্তা। তিনি চিকিৎসকের কক্ষে প্রবেশে বাধা দিচ্ছিলেন।

চট্টগ্রাম নগরের খুলশী এলাকার অভিজাত আবাসিক অঞ্চলে অবস্থিত ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনের বাসভবন থেকে নরেন্দ্র ধর (৩৮) নামে এক কর্মকর্তার লাশ উদ্ধারকে ঘিরে রহস্য ও নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। লাশ উদ্ধারের পর বিষয়টি গোপন রাখার অনুরোধ জানানো হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ, যা ঘটনাটিকে আরও আলোচনায় এনে দিয়েছে।

মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। পরে বিষয়টি জনসমক্ষে এলে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন স্তরে আলোচনা শুরু হয়।

বিজ্ঞাপন

খুলশী থানার ওসি মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, “সকালে লাশটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যু হতে পারে। তবে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট না পাওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।”

তবে নগর পুলিশের উত্তরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, লাশ উদ্ধারের সময় ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনের পক্ষ থেকে ঘটনাটি গণমাধ্যমে প্রকাশ না করার অনুরোধ জানানো হয়।

তিনি বলেন, “তারা বিষয়টি সংবেদনশীল উল্লেখ করে মিডিয়ায় না যাওয়ার অনুরোধ করেছিল। আমরা নিয়ম অনুযায়ী কাজ করেছি।”

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, প্রাথমিক তদন্ত, আলামত সংগ্রহ এবং তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রেও এক ধরনের নিয়ন্ত্রণমূলক অবস্থান লক্ষ্য করা গেছে। এমনকি চমেক হাসপাতালে লাশ নেওয়ার পরও ভারতীয় মিশনের কর্মকর্তাদের তৎপরতা অব্যাহত ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।

হাসপাতালের একটি সূত্র জানায়, ময়নাতদন্ত প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার জন্য ভারতীয় মিশনের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়। কিছু প্রশ্নের জবাব দিলেও বেশ কিছু বিষয়ে তারা মন্তব্য করতে অনিচ্ছুক ছিলেন।

চমেক হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “ভারতীয় মিশনের একজন কর্মকর্তা এসে পুরো প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার অনুরোধ করেন। কিছু বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি সংযত ছিলেন এবং অনেক প্রশ্নের উত্তর দেননি।”

তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন ফরেনসিক চিকিৎসকরা। হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ সূত্র দাবি করেছে, ভারতীয় পক্ষ শুরু থেকেই ময়নাতদন্ত প্রক্রিয়াকে ‘লো-প্রোফাইল’ রাখার চেষ্টা করছিল।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) সহকারী কমিশনার (মিডিয়া) আমিনুর রশিদ জানান, মৃত নরেন্দ্র ধর ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনের প্রটোকল অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

এদিকে অভ্যন্তরীণ কিছু সূত্রের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে নরেন্দ্র ধর মানসিক চাপে ছিলেন। তবে সেই চাপের কারণ সম্পর্কে কেউ স্পষ্ট করে কিছু বলতে রাজি হননি।

তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, “ঘরের ভেতরে মৃত্যু হলে কিছু নির্দিষ্ট প্রটোকল অনুসরণ করতে হয়। সাধারণত ঘটনাস্থল সিলগালা করে আলামত সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু এটি বিদেশি মিশনের এলাকা হওয়ায় আমরা পুরোপুরি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারিনি।”

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, বিদেশি মিশনে কোনো ঘটনা ঘটলে ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী কিছু কূটনৈতিক সংবেদনশীলতা বজায় রাখতে হয়। তবে সেটি তদন্ত প্রক্রিয়াকে সীমাবদ্ধ করার সুযোগ দেয় না।

সংশ্লিষ্টদের মতে, একজন বিদেশি মিশনকর্মীর মৃত্যু স্বাভাবিক ঘটনা হলেও, বিষয়টি ঘিরে অতিরিক্ত গোপনীয়তা ও অস্বাভাবিক তৎপরতা জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে লাশ উদ্ধারের তথ্য গোপন রাখার চেষ্টা এবং তদন্ত প্রক্রিয়াকে সীমিত রাখার অভিযোগ ঘটনাটিকে আরও আলোচিত করে তুলেছে।

তবে এখন পর্যন্ত ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়ায় মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু জানা যায়নি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন