চট্টগ্রাম বিভাগে ৩০০ জন শিশুকে নিয়ে যৌথ গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, এসপেরিয়া হেলথ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের পেডিয়াট্রিক রিসার্চ গ্রুপ। গবেষণায় দেখা গেছে, হামে আক্রান্ত ৩০০ জন শিশুর মধ্যে ৮৫.২ শতাংশই ছিল টিকাবিহীন। তাছাড়া শিশুদের শারীরিক জটিলতা ও হামে আক্রান্ত হওয়ার পেছনের কারণ হিসেবে অপুষ্টির বিষয়টি উঠে এসেছে। এসব শিশুর দেহে শতভাগ ক্ষেত্রে ‘বি৩ জেনোটাইপ’ ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে।
বুধবার দুপুরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব তথ্য উন্মোচন করা হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. তসলিম উদ্দিন, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ডা. মো. জসিম উদ্দিনসহ বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ও গবেষকেরা।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, চট্টগ্রাম বিভাগের ৩০০ জন হাম আক্রান্ত শিশুর ওপর গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়েছে। তাদের বয়স ২ মাস থেকে ১১ বছর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। গবেষণায় আর্থিক ও সার্বিক সহায়তা করেছে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড।
গবেষণায় দেখা যায়, আক্রান্ত শিশুদের এক-তৃতীয়াংশই তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছিল। অপুষ্টিই শিশুদের হামের মারাত্মক জটিলতায় পড়ার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। গবেষণার আওতায় আসা ৩০০ জন শিশুর মধ্যে ৩১ শতাংশ তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছিল। এছাড়া আক্রান্তদের মধ্যে ১১ শতাংশের বয়স ৬ মাসের নিচে, ২৩.৫ শতাংশ শিশুর বয়স ১-৫ বছর। আর ৪৬ শতাংশ শিশুর বয়স ছিল ৯ মাসের কম। অর্থাৎ নিয়মিত টিকাদানের নির্ধারিত বয়সে পৌঁছানোর আগেই তারা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুদের ৮৫.২ শতাংশই ছিল টিকাবিহীন। টিকাবিহীন শিশুদের মধ্যে ৫২ শতাংশের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের অসচেতনতা বা টিকার তারিখ ভুলে যাওয়া মূল কারণ ছিল। এছাড়া গত ছয় মাসে মাত্র ৩২.১ শতাংশ শিশু ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল পেয়েছিল। যেসব শিশু ভিটামিন ‘এ’ পায়নি, তাদের ৫৯ শতাংশই গুরুতর জটিলতায় ভুগেছে। আক্রান্তদের মধ্যে ৭৫.৫ শতাংশ শিশু ছিল গ্রামীণ এলাকার এবং ৬৪.৮ শতাংশ ছিল নিম্ন আর্থ-সামাজিক পরিবারের।
সংক্রমণের উৎস বিশ্লেষণে দেখা যায়, গবেষণায় থাকা আক্রান্ত শিশুদের প্রায় ৫৯.৪ শতাংশই কোনো না কোনো স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র বা হাসপাতাল থেকে হামের ভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছে, যা হাসপাতালগুলোর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতাকে নির্দেশ করে। আর ১৬.৩ শতাংশ শিশু পূর্বে হামে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সংস্পর্শে এসেছে বলে তথ্য মিলেছে। এছাড়া ১৮.৯ শতাংশ শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানো হয়নি। এসব শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা খুবই দুর্বল।
গবেষণার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক দিক ছিল ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্সিং পরীক্ষায় শতভাগ নমুনায় ‘বি৩ জেনোটাইপ’ শনাক্ত হওয়া। যা আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ে পূর্বে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, হাম একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ, এতে কোনো শিশুর মৃত্যু গ্রহণযোগ্য নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় অর্ধেক শিশু টিকার বয়স হওয়ার আগেই আক্রান্ত হচ্ছে। তাই সময়মতো সঠিক নিয়মে টিকাদান নিশ্চিত করতে হবে। তিনি টিকার কভারেজ ৯৫ শতাংশে উন্নীত করা, অপুষ্টি দূর করা এবং প্রয়োজনে বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা ও হাসপাতালগুলোর সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করার নির্দেশ দেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এসপেরিয়া হেলথ কেয়ার লিমিটেডের চেয়ারম্যান গোলাম বাকি মাসুদ। তিনি বলেন, গবেষণাকে কেবল বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদনে সীমাবদ্ধ না রেখে এর উপাত্তগুলোকে বাস্তবভিত্তিক জনস্বাস্থ্য উদ্যোগে রূপান্তর করতে হবে। গবেষণার মূল উদ্দেশ্য তথ্য তৈরি করা নয়, বরং জীবন বাঁচানো।
এআরবি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

