তিতাসে অপ্রতিরোধ্য আ.লীগের জাহাঙ্গীর-রিপন বাহিনী

তিতাসে অপ্রতিরোধ্য আ.লীগের জাহাঙ্গীর-রিপন বাহিনী

কুমিল্লার তিতাস উপজেলার শাহপুর গ্রামটি যেন এক সন্ত্রাসী ও ভয়াল অভয়ারণ্যের নাম। এই গ্রামে এখনো সক্রিয় রয়েছে ফ্যাসিবাদের দোসর সশস্ত্র ‘জাহাঙ্গীর আলম-রিপন বাহিনী’। এই বাহিনীর প্রধান মজিদপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক দুর্ধর্ষ জাহাঙ্গীর আলম। তার নেতৃত্বাধীন এই ক্যাডার বাহিনী পুরো এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে।

বিজ্ঞাপন

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর এই বাহিনীর ৩০ সদস্যের মধ্যে প্রধান জাহাঙ্গীর আলম, সেকেন্ড ইন কমান্ড রিপন এবং ক্যাডার মান্নান, লিটন, শাওন ও মতিন—এই ছয়জন এখনো অপরাধমূলক কার্যক্রমে পুরোপুরি সক্রিয় রয়েছেন। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্থানীয় সংসদ সদস্যের সঙ্গে শাহপুরের জাহাঙ্গীর ও তার অনুসারী সন্ত্রাসীদের একত্রে বিভিন্ন ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক বিরাজ করছে।

অভিযোগ রয়েছে, পুলিশ প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে জাহাঙ্গীর আলমের নেতৃত্বে সন্ত্রাসীরা এখনো দোর্দণ্ড প্রতাপে বাড়িঘর দখল, জুয়া, বিচার বাণিজ্য, মাদক ব্যবসা ও চাঁদাবাজি চালিয়ে যাচ্ছে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শাহপুর গ্রামে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার ভোটারের বসবাস। বিশাল এই গ্রামের বাসিন্দাদের একটি বড় অংশ কৃষিজীবী, প্রবাসী ও ব্যবসায়ী। এলাকার বর্তমান পরিস্থিতি দেখে দৃশ্যত মনে হয়, সেখানে আওয়ামী লীগ এখনো ক্ষমতায় রয়েছে এবং বিএনপি সমর্থিত লোকজন অত্যন্ত অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। তাদের চোখে-মুখে চরম ক্লান্তি আর আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০০৮ সাল থেকেই শাহপুর ও পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতে আওয়ামী সন্ত্রাসের মধ্যযুগীয় বর্বরতা চলছে। এই বাহিনীর কাছে বিপুল পরিমাণ অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের মজুদ রয়েছে। অতীতে সেনাবাহিনী ও পুলিশ অভিযান চালিয়ে অস্ত্র উদ্ধার করলেও এই চক্রের দৌরাত্ম্য থামেনি। ৫ আগস্টের পর জাহাঙ্গীর আলম অস্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কিছুদিন হাজতবাস করলেও পরবর্তীতে জামিনে বেরিয়ে আসেন। জেলমুক্ত হওয়ার পর থেকেই তিনি বিএনপিতে পুনর্বাসিত হওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন এবং দলের কিছু নেতার সঙ্গে গোপনে সখ্য গড়ে তোলেন।

অভিযোগ রয়েছে, বিএনপি সরকার গঠনের পর ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের এই ক্যাডার বাহিনী খোলস পাল্টে ফেলে। জাহাঙ্গীর আলম শাহপুর গ্রামে তার নিজ বাড়িতে স্থানীয় সংসদ সদস্যকে রাজসিক সংবর্ধনা দেন এবং দুই শতাধিক নেতাকর্মীকে ভূরিভোজন করিয়ে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেন। এভাবে স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের সান্নিধ্য লাভ করে তিনি ও তার অনুসারীরা বিএনপিতে পুনর্বাসিত হয়েছেন বলে এলাকায় প্রচার চালাতে থাকেন। সম্প্রতি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের গৌরীপুর স্টেশনেও এই বাহিনীর সদস্যদের সরব উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে।

স্থানীয়দের মতে, জাহাঙ্গীর বাহিনীর চাঁদাবাজি ও জবরদখল শুধু শাহপুরেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতেও বিস্তার লাভ করেছে। প্রবাসীরা বাড়িতে আসতে চাইলে এই বাহিনীর অনুমতি নিতে হয় এবং মোটা অঙ্কের চাঁদা দিতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া শাহপুর গ্রামে ‘সিএনজি ঘর’ নামের একটি আস্তানায় প্রতিদিন গভীর রাতে জুয়ার বড় আসর বসে এবং ইয়াবাসহ মাদকের পাইকারি কারবার পরিচালিত হয়।

গত ৪ ফেব্রুয়ারি বাহিনীর প্রধান জাহাঙ্গীর আলম গ্রেপ্তার হলেও পরে জামিনে মুক্তি পান। এ ছাড়া গত বছর ২৮ নভেম্বর যৌথ বাহিনীর হাতে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হন সন্ত্রাসী মান্নান এবং ৭ এপ্রিল গ্রেপ্তার হন রিপন। তবে ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি হওয়া সত্ত্বেও রিপন বর্তমানে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

জোরপূর্বক বিভিন্ন মানুষের জমিতে বালু ফেলে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দাম দাবি করার মতো নানা অভিযোগও রয়েছে এই চক্রের বিরুদ্ধে। শাহপুর ও পার্শ্ববর্তী এলাকাকে সাধারণ মানুষের বসবাসের উপযোগী করতে ফ্যাসিস্ট সন্ত্রাসী জাহাঙ্গীর আলম ও তার অনুসারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের জোরালো দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে মজিদপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলমকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল ধরেননি। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে কুমিল্লা-২ আসনের সংসদ সদস্য সেলিম ভূঁইয়ার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি মিটিংয়ে আছেন বলে খুদে বার্তা পাঠান।

তিতাস থানার ওসি মমিনুল হক বলেন, জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে সক্রিয় সব সন্ত্রাসীকে আটক করা হয়েছে। এর বাইরেও যদি কেউ সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত থাকে, তবে ভুক্তভোগীদের আমার কাছে পাঠান, আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন