আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

কালো পলিথিনে পাওয়া হাত দেখালো টুকরো লাশের সন্ধান

জমির উদ্দিন, চট্টগ্রাম

কালো পলিথিনে পাওয়া হাত দেখালো টুকরো লাশের সন্ধান

চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী এলাকার শহিদনগর চারতলার মোড়। ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি নামেনি। ফুটপাতের এক পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দু–একজন পথচারী হঠাৎই চোখে পড়ে একটি কালো পলিথিন ব্যাগ। কোনো কাক বা কুকুর ঘাঁটাঘাঁটি করছে-এমন দৃশ্য ভেবে তাদের একজন এগিয়ে গিয়ে ব্যাগটি একটু সরাতেই থমকে যায়। মানুষের হাত। দুটি হাত। রক্তমাখা, সদ্য কাটা। সেখান থেকেই শুরু হয় পুরো হত্যার রহস্যোদ্ঘাটনের গল্প।

বিজ্ঞাপন

২১ জানুয়ারি রাত দেড়টা। বায়েজিদ বোস্তামী থানার ওসি জাহেদুল কবির জানান, ডিউটি অফিসারের ফোনে সংবাদ পৌঁছাতেই বায়েজিদ বোস্তামী থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে আসে। ছিন্নভিন্ন দুটি হাতের সামনে দাঁড়িয়ে তদন্ত কর্মকর্তাদের প্রথম কাজ ছিল-এই হাত কার? কোনো লাশ কোথাও আছে কি? নাকি এটি নিছক কোনো গুমের ঘটনা! পলিথিনের ভাঁজ থেকে বেরিয়ে থাকা চামড়ার রং, হাতের গঠন, বয়সের অনুমান-সবমিলিয়ে পুলিশের মনে প্রথম প্রশ্নই ছিল-এই মানুষটির আর কোথায় কী লুকানো আছে? হাত দুটি উদ্ধার করে পাঠানো হলো চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। আর শুরু হলো অনুসন্ধান।

পুলিশের চট্টগ্রাম উত্তর জোনের ডিসি আমিরুল ইসলাম জানান, তদন্ত দল হাতের আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করে জাতীয় পরিচয়পত্র ডাটাবেসে মিলিয়ে দেখতে থাকে। অল্পসময়েই মিলে যায় পরিচয়। হতভাগ্য ব্যক্তিটির নাম মো. আনিছ (৩৮)। বাড়ি রাউজানের চিকদাইর ইউনিয়নের অন্নপূর্ণা বাড়ির পাশে। আনিছের নাম নিশ্চিত হওয়ার পর পুলিশ তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পারে, তিনি ২০ জানুয়ারি থেকে নিখোঁজ।

হঠাৎ পাওয়া একটি সূত্র যেন পুরো অন্ধকার ঘরে হঠাৎ বাতি জ্বালিয়ে দিল। এখন আনিছের বাকি দেহাংশ কোথায়? সেই প্রশ্ন পুলিশের। আনিছ নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে পরিবার উদ্বিগ্ন ছিল। কিন্তু দুই কাটা হাত উদ্ধারের পর সেই উদ্বেগ বদলে গেল অজানা শোকে। পুলিশ পরিবারের বক্তব্য নিয়ে আবার মাঠে নামলো।

তদন্তের এক পর্যায়ে উঠে আসে একটি নতুন নাম সুফিয়া আক্তার (৩৯)। আনিছের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের ‘সম্পর্ক’, আবার সাম্প্রতিক মনোমালিন্য। পুলিশ সন্দেহের কেন্দ্রে রাখে সুফিয়াকে।

রাউজান থেকে বায়েজিদ-এক নারীর দ্বিধাহীন নির্মমতা

২২ জানুয়ারি ভোররাতে বায়েজিদের পাঠানপাড়া এলাকা থেকে সুফিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রথমে অস্বীকার করলেও জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে ভেঙে পড়েন তিনি। তখনই বেরিয়ে আসে টুকরো টুকরো হত্যার ভয়াবহ বর্ণনা।

সুফিয়ার ভাষ্য-একসময় তাদের মধ্যে সুসম্পর্ক থাকলেও পরবর্তীতে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়। সম্পর্ক ভেঙে গেলে আনিছের প্রতি তার মধ্যে জমতে থাকে তীব্র ক্ষোভ। সেই ক্ষোভই শেষ পর্যন্ত হত্যার পরিকল্পনায় রূপ নেয়।

২০ জানুয়ারি বিকেল ৩টার দিকে সুফিয়া কৌশলে আনিছকে ডেকে নেন পাঠানপাড়ার বাসায়। বাসায় ঢোকার পরই শুরু হয় পূর্বপরিকল্পিত আক্রমণ। প্রথম আঘাতটি আসে পাথরের শীল দিয়ে, যা আনিছকে সঙ্গে সঙ্গে গুরুতর জখম করে। এরপর চাপাতির ধারালো কোপে তার মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। যা ঘটলো এরপর, তা শোনার মতো সাহস অনেকেরই হয়তো থাকবে না।

সুফিয়া ও তার সহযোগীরা আনিছের দেহ লোহার দা ও চাপাতি দিয়ে টুকরো টুকরো করে। প্রতিটি অংশ আলাদা করে কালো পলিথিনে ভরা হয়। তারপর লাশ লোপাটের উদ্দেশ্যে শহিদনগর ও শীতলকর্নার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ফেলা হয়। সুফিয়ার দেখানো স্থানে গিয়ে পুলিশ উদ্ধার করে আনিছের বাকি দেহাংশ। ভোররাতের অন্ধকারে যেমন দুইটি হাত ভেসে উঠেছিল, দিনের আলোতে তেমনই মিলল শরীরের অন্যান্য অংশ। যে হাত দুটি প্রথমে পথচারীর চোখে পড়ে, সেই হাতই হয়ে ওঠে পুরো হত্যার তদন্তের কেন্দ্রবিন্দু।

পুলিশের চট্টগ্রাম উত্তর জোনের ডিসি আমিরুল ইসলাম বলেন, ভোরে দুটি কাটা হাত উদ্ধারের পরই আমরা বুঝতে পারি এটি একটি গুম বা অপঘাত নয়, বরং পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। সেই সূত্র ধরে টানা অভিযান ও তথ্য–প্রযুক্তির সহায়তায় খুব অল্প সময়ে মূল আসামিকে গ্রেপ্তার এবং ভিকটিমের খণ্ডিত দেহাংশগুলো উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...