চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের সারিকাইত ইউনিয়নের কাজীপাড়া তেমাথা থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার পশ্চিমে চৌকাতলী বেড়িবাঁধ। পৌষের হাড় কাঁপানো শীত আর ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা চারপাশ। ঘন কুয়াশা যেন জলবায়ু উদ্বাস্তুদেরই দীর্ঘশ্বাস। বেড়িবাঁধের ওপর জবুথবু হয়ে বসে আছেন বাস্তুচ্যুত বিধবা মনোবালা।
গত তিন যুগে তিনবার সমুদ্রের গ্রাসে ভিটেমাটি হারিয়ে এখন বাস করছেন বেড়িবাঁধের ঢালের এক কুঁড়েঘরে। মুখে দুশ্চিন্তার গভীর ভাঁজ। আজই দুই প্রতিবন্ধী সন্তানকে নিয়ে ছাড়তে হবে মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়টুকু।
পাশে বসা মন্টু মাঝি জানালেন এক চরম আল্টিমেটামের কথা। সরকারি লোক এসে জানিয়ে গেছে, সরকার বেড়িবাঁধ পাকা করবে। নির্দেশ পরিষ্কার—আজকের মধ্যেই ঘর সরিয়ে নিতে হবে। মন্টু মাঝি আঞ্চলিক সুরে বিলাপ করে বলেন, ‘সরকারি লোক আই কই গেছে, আইজ্জা ঘর না ছাইড়লে কেরাং (স্কেভেটর) দি টানি হালাই দিব।’ দ্রুত ঘর না ছাড়লে ঘর পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকির কথাও প্রতিবেদককে জানালেন তিনি।
মনোবালা ও মন্টুদের জীবনের গল্পটা শুধুই ভাঙাগড়ার। আজ থেকে তিন যুগ আগে রাক্ষুসে সমুদ্র তাদের পৈতৃক ভিটেমাটি গিলে খেয়েছিল। এই সমুদ্রই আবার তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। সমুদ্র থেকেই আসে বেঁচে থাকার খোরাক। গত ৩০ বছরে তিনবার নতুন করে ঘর বেঁধেছেন প্রত্যেকেই। প্রতিবারই ভাঙনের কবলে পড়ে সর্বশেষ আশ্রয় নিয়েছিলেন চৌকাতলীর বেড়িবাঁধের ঢালে। উন্নয়ন এবার সেই শেষ আশ্রয়টুকুও কেড়ে নিচ্ছে।
মন্টু মাঝির চারটি ছোট শিশু, যাদের বয়স ২ মাস থেকে ৬ বছর পর্যন্ত। এই কনকনে ঠান্ডায় তাদের নিয়ে আজ রাতে কোথায় মাথা গুঁজবেন, তা তার জানা নেই। শুধু মনোবালা কিংবা মন্টু মাঝি নন, পশ্চিম চৌকাতলী বেড়িবাঁধের এই অংশে বসবাসরত প্রায় ৩০টি জেলে পরিবারের একই করুণ নিয়তি।
পুনর্বাসন ছাড়া এই তীব্র শীতে উচ্ছেদের বিষয়ে সন্দ্বীপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মংচিংনু মারমা আমার দেশকে বলেন, জনস্বার্থে বেড়িবাঁধের কাজ চলমান রাখতে হবে। তবে মানবিক দিকটি বিবেচনা করে জায়গা খালি করার জন্য আমরা তাদের সময় দিচ্ছি এবং পুনর্বাসনের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।
বেড়িবাঁধ প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো) চট্টগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী তানজীর সাইফ আমার দেশকে জানান, বাঁধে ব্লক বসানোর জন্য দ্রুত জায়গা খালি করতে হবে, অন্যথায় কাজ শুরু করা সম্ভব নয়।
এ বিষয়ে সারিকাইতের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তাসলিমা বেগমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি আমার দেশকে বলেন, উচ্ছেদের কারণে অনেকেই অমানবিক জীবন কাটাচ্ছে। এই দুস্থ পরিবারগুলোর জন্য জরুরি সরকারি সহায়তা প্রয়োজন বলে জানান তিনি।
সরেজমিনে দেখা যায়, কেউ ঘরের টিন খুলছেন, কেউ খুঁটি উপড়ে ফেলছেন। আসবাবপত্র, মাছ ধরার জাল—সব পড়ে আছে রাস্তার ওপর। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, বেড়িবাঁধ সংস্কার সন্দ্বীপের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি। কিন্তু যেই মানুষগুলো ভাঙনকবলিত হয়ে সব হারিয়েছে, এই হাড়কাঁপানো শীতে তাদের বিকল্প ব্যবস্থা না করে ঘর থেকে বের করে দেওয়া কতটা মানবিক—সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
বেড়িবাঁধ সংস্কার আর উন্নয়নের বড় বড় মেশিনের তীব্র শব্দে এসব ঘরহারা মানুষের আর্তনাদ কি চাপা পড়ে যাবে? রাষ্ট্রের নথিতে কি কোনো দিন জলবায়ু উদ্বাস্তুদের আহাজারি পৌঁছাবে? সন্ধ্যা নামলেই যখন শীতের তীব্রতা বাড়বে, তখন বিধবা মনোবালা ও তার প্রতিবন্ধী সন্তানদের ঠাঁই হবে কোথায়? এক মাসের শিশুসন্তান নিয়ে কোথায় যাবেন সবিতা দাস? এই প্রশ্নের উত্তর আপাতত কারও জানা নেই।
উল্লেখ্য, সন্দ্বীপের এই ৩০ পরিবারের মতো উপকূলীয় এলাকায় প্রতি বছর কয়েক হাজার মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত হচ্ছে, যাদের নিদারুণ জীবনসংগ্রামের গল্প লেখা হয়নি কোথাও, নেই সঠিক পরিসংখ্যানও।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

