জানালা খুললেই তামাকের ধোঁয়া, অসুস্থ হয়ে পড়ছে পাশের মানুষ

উপজেলা প্রতিনিধি, চকরিয়া (কক্সবাজার)

জানালা খুললেই তামাকের ধোঁয়া, অসুস্থ হয়ে পড়ছে পাশের মানুষ
ছবি: আমার দেশ

জানালার কপাট খুললেই ভেতরে ঢুকে পড়ে তীব্র তামাকের গন্ধ। শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, চোখ জ্বালা করে, শিশুরা কাশতে থাকে-এটাই এখন কক্সবাজারের চকরিয়ার কাকারা ইউনিয়নের কয়েক পরিবারের প্রতিদিনের বাস্তবতা।

বসতবাড়ির জানালার ঘেঁষা গড়ে ওঠা তামাক প্রক্রিয়াজাতকরণের অস্থায়ী শেড যেন তাদের স্বাভাবিক জীবন কেড়ে নিয়েছে। দূষণ, স্বাস্থ্যঝুঁকি আর অসহায়ত্বের মধ্যে দিন কাটানো এই পরিবারগুলোর গল্প শুধু একটি বাড়ির নয়! এটি গ্রামবাংলার নীরব এক পরিবেশ সংকটের প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এই ঘটনায় বৃহসস্পতিবার দুপুরে চকরিয়ার ইউএনও শাহিন দেলোয়ারের কাছে অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগী বাসিন্দা মো. ছরওয়ার আলম। ইউএনও অভিযোগ গ্রহণ করে দ্রুত সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

বাড়ির বাসিন্দা ছরওয়ার আলম বলেন, এই জানালার পাশ দিয়েই তামাকের বিষাক্ত গ্যাস ঢুকে ঘরে যায়। রাতে ঘুমানো যায় না। বাচ্চাদের কাশি, বড়দের শ্বাসকষ্ট আরও বেড়ে গেছে। স্ত্রীসহ গর্ভবতী নারীরা নাক-মুখ ঢেকে ঘরে থাকতে বাধ্য।

সরেজমিন দেখা গেছে, ঘরের যেটি প্রধান জানালা তার ঠিক নিচে কাঠের খুঁটির ওপর একটি দীর্ঘ টিনশেড। সেখানে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত শুকানো হয় তামাকপাতা। এই প্রক্রিয়ায় বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে ধুলা, অ্যালার্জি-সৃষ্টিকারী উপাদান, আর কখনও কখনও উঠে আসে ধোঁয়ার মতো গন্ধ। দুপুরের দিকে গরমের সঙ্গে মিলেমিশে পরিস্থিতি আরও অসহনীয় হয়ে ওঠে। পাড়ার আরও কয়েকজন বাসিন্দা জানান, গত এক বছর ধরে এই কার্যক্রম চললেও সম্প্রতি তা বাড়তি পরিমাণে শুরু হয়েছে। যার ফলে তারা নাক-চোখ জ্বালা, মাথা ঘোরা, শ্বাসকষ্টসহ নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন।

এক নারী বাসিন্দা অভিযোগ করেন, জানালা খুললে পুরো ঘর তামাকের দুর্গন্ধে ভরে যায়। খাবার রাখা যায় না। শিশুরা বারবার অসুস্থ হচ্ছে। তামাক শুকানোর জন্য এত কাছাকাছি জায়গা কীভাবে ব্যবহার হয়-আমরা বুঝতে পারছি না।

কার্যক্রম পরিচালনা করছেন স্থানীয় মহি উদ্দিন ভুক্তভোগীরা জানান, তামাকের এই প্রক্রিয়াজাতকরণ কার্যক্রম পরিচালনা করছেন একই এলাকার বাসিন্দা মহিউদ্দিন। তার মোবাইল নম্বরও একটি নোটিশ বোর্ডে সেঁটে রাখা হয়েছে। অভিযোগ করা হলেও তিনি কোনো ব্যবস্থা নেননি।

সরোয়ার আলম বলেন, তাকে বারবার বলেছি-এত কাছাকাছি তামাকের কাজ করলে মানুষের ক্ষতি হয়। কিন্তু তিনি শোনেন না। আমাদের যেন কিছু যায়–আসে না।

পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, তামাক প্রক্রিয়াজাতকরণ একটি ঝুঁকিপূর্ণ ও ক্ষতিকর কার্যক্রম, যা আবাসিক এলাকায় বা ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে পরিচালনা নিষিদ্ধ। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫–এর কয়েকটি ধারা এখানে সরাসরি লঙ্ঘন হচ্ছে বলে জানান চট্টগ্রামের পরিবেশবিদ ইদ্রিস আলী। তিনি বলেন, জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ফেলে এমন কার্যক্রমের জন্য পরিবেশগত ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক। পরিবেশ দূষণ সৃষ্টি বা দূষণের মাধ্যমে মানবদেহে ক্ষতির কারণ হওয়া দণ্ডনীয়। যে কোনো শিল্প–কারখানা স্থাপনের ক্ষেত্রে আবাসিক এলাকার ন্যূনতম দূরত্ব বজায় রাখা বাধ্যতামূলক। পরিবেশগত ক্ষতি বা বিপন্নতা সৃষ্টি করলে তার বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান রয়েছে।

ভুক্তভোগী পরিবারটির দাবি, একটি পরিবারের জানালার পাশেই তামাক প্রক্রিয়াজাতকরণ কার্যক্রম চালানো সরাসরি এই আইনগুলোর লঙ্ঘন।

চিকিৎসকদের মতে, তামাক শুকানো ও প্রক্রিয়াজাত করার সময় বাতাসে ভেসে বেড়ায় নিকোটিন কণা, অ্যালার্জেন, ছত্রাক, ধুলা ও তীব্র গন্ধ-যা দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসযন্ত্রের রোগ সৃষ্টি করতে পারে। এই ধরনের পরিবেশে শিশু, বৃদ্ধ এবং গর্ভবতী নারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। তামাকের রাসায়নিক উপাদান গর্ভস্থ শিশুর বিকাশেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

মো. ছরওয়ার আলমের ভাই সাহেদ খান ছোটন জানান, স্থানীয় পর্যায়ে বারবার অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাননি। অবশেষে তারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত আবেদন করেছেন।

আবেদনে তারা উল্লেখ করেছেন, এই কার্যক্রম আমাদের পরিবার ও পুরো এলাকার মানুষকে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে ফেলছে। তদন্ত করে তামাক কোম্পানির এই ক্ষতিকর কার্যক্রম বন্ধ বা নিরাপদ দূরত্বে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা হোক।

ইউএনও শাহিন দেলোয়ার বলেন, আমরা আবেদনটি পেয়েছি। নোটিশ পাঠানোর ব্যবস্থা করছি। আবাসিক এলাকায় তামাক প্রক্রিয়াজাতকরণ অনুমোদিত নয়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন