কিশোর গ্যাং দমনে চট্টগ্রামে বিশেষ অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। গত রোববার সন্ধ্যা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত জেলার ১৭ থানা এলাকায় একযোগে এই অভিযানে ৪৪৫ জনকে আটক করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৫৪ জন কিশোর। যাচাই-বাছাই শেষে ২৯৩ জনকে মুচলেকা নিয়ে অভিভাবকদের জিম্মায় দেওয়া হয়েছে। অপরাধে সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় ৬১ জনের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মাদকসহ বিভিন্ন অভিযোগে আরও ৯১ জনকে আটক করা হয়েছে।
তবে থানায় ধরে আনা কিশোরদের নিয়ে এই তৎপরতার মধ্যেই একটি প্রশ্ন বারবার উঠছেÑযাদের আড়াল থেকে এসব কিশোর মাদক, অস্ত্র, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও সংঘর্ষে জড়াচ্ছে, সেই ‘বড় ভাই’রা কোথায়? তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কতটা নেওয়া হচ্ছে?
চট্টগ্রাম নগর পুলিশের ২০২৪ সালের একটি জরিপে নগরে প্রায় ২০০টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় থাকার তথ্য উঠে আসে। এসব গ্যাংয়ের সদস্য ছিল প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন। ওই সময় পুলিশ জানিয়েছিল, কিশোর গ্যাংকে পৃষ্ঠপোষকতা বা প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে পাঁচজন ওয়ার্ড কাউন্সিলরসহ ৬৪ জন ‘বড় ভাইয়ের’ তালিকা তাদের কাছে আছে। জরিপে আরও দেখা যায়, ছয় বছরে কিশোর গ্যাংয়ের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া ৫৪৮টি অপরাধের মধ্যে ৪০টিই ছিল খুন।
সহিংসতার ভয়ংকর চিত্র দেখা গেছে ২০২৪ সালের এপ্রিল-জুনেও। ওই বছরের ৫ এপ্রিল থেকে ৮ জুন, দুই মাসে কিশোর গ্যাংয়ের হামলায় পাঁচটি খুনের ঘটনা সামনে আসে। ৫ এপ্রিল কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের হাত থেকে ছেলেকে বাঁচাতে গিয়ে হামলার শিকার হন দন্তচিকিৎসক কুরবান আলী। পাঁচ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ১০ এপ্রিল তিনি মারা যান। এ ঘটনায় ১২ জনের নাম উল্লেখ করে হত্যা মামলা হয়। ১৩ এপ্রিল নগরের চকবাজারে কিশোর গ্যাংয়ের হামলায় নিহত হন এইচএসসি পরীক্ষার্থী আশফাক কবির সাজিদ (১৭)।
৩ জুন আগ্রাবাদের চারিয়াপাড়ায় পাড়াভিত্তিক বিরোধের জেরে ছুরিকাঘাতে খুন হন নুরুল আজিম (১৭)। এ ঘটনায় ছুরিসহ চার কিশোরকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই সময় ইপিজেড এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের মারামারির মধ্যে পড়ে প্রাণ হারান কারখানাশ্রমিক মেহেদী হাসান। ৮ জুন পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে মোটরসাইকেলের বিকট শব্দ নিয়ে বিরোধের জেরে ছুরিকাঘাতে খুন হন তরুণ মনিরুজ্জামান রাফি। এ ঘটনায় সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়, যাদের বয়স ২০ থেকে ২২ বছর। ইয়াবার টাকা না পেয়ে মাকে হত্যার ঘটনাও ওই সময়ের তালিকায় ছিল। ২০২৫ সালের মে মাসে হালিশহরে কিশোর গ্যাংয়ের দুই পক্ষের দ্বন্দ্বে প্রাণ হারান কলেজছাত্র ওয়াহিদুল হক ওরফে সাব্বির (১৮)। ছুরিকাঘাতে আহত সাব্বির পাঁচ দিন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর মারা যান।
এসব হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশের তালিকায় থাকা ৬৪ ‘বড় ভাই’ নিয়ে প্রশ্ন আরো জোরালো হয়। তখনকার প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, তালিকায় থাকা পৃষ্ঠপোষকদের অনেকে ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধ থামছে না। কিশোরদের অপরাধে জড়ানোর পেছনে শুধু বন্ধুত্ব বা আড্ডা নয়, বয়সে বড়দের প্রভাবের কথাও বিভিন্ন ঘটনায় উঠে এসেছে। পুলিশের একটি জরিপে দেখা যায়, নগরের তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নবম ও দশম শ্রেণির অনেক শিক্ষার্থী ক্লাস ফাঁকি দিয়ে অভিভাবকদের অগোচরে ‘বড় ভাই’দের প্ররোচনায় অপরাধে জড়াচ্ছে। শুরুতে ‘হিরোইজম’ দেখাতে গেলেও পরে তারা আর বেরিয়ে আসতে পারে না বলে জরিপে উল্লেখ করা হয়।
কিশোর থেকে বড় সন্ত্রাসী
কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে বড় অপরাধীদের যোগসূত্রের আরেকটি দিকও আছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের শহীদুল ইসলাম ওরফে বুইস্যা চুরি ও ছিনতাই দিয়ে অপরাধজগতে হাতেখড়ি নেন। পরে মাদক কারবারে জড়িয়ে নিজের বাহিনী গড়ে তোলেন। অস্ত্র, চাঁদাবাজি ও মাদকসহ নানা অপরাধে তার নাম আসে। অর্থাৎ কিশোর গ্যাংয়ের সংশ্লিষ্টতা কেবল কিশোর বয়সের সংঘর্ষে সীমাবদ্ধ থাকছে না। অভিযোগ আছে, কিছু ক্ষেত্রে এই চক্রের সদস্যরা পরে আরো বড় অপরাধী নেটওয়ার্কে যুক্ত হচ্ছে।
রোববারের অভিযানে পাড়া-মহল্লা, বাজার, রেলস্টেশন, মাঠ ও পরিত্যক্ত-নির্জন স্থানসহ কিশোরদের আড্ডার সম্ভাব্য জায়গায় তল্লাশি চালানো হয়। আটক কিশোরদের থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে শুধু পুলিশের অভিযান যথেষ্ট নয়, পরিবার ও সমাজকেও দায়িত্ব নিতে হবে। অভিযানের পর অভিভাবকদের থানায় ডেকে সন্তান কখন, কোথায় ও কার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে, নির্ধারিত সময়ে বাড়ি ফিরছে কি না, সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে বলা হয়েছে। পড়াশোনা, চলাফেরা, বন্ধুবান্ধব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিয়েও নজরদারির পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
পুলিশ সুপার আরও বলেন, এ ধরনের বিশেষ অভিযান ও নজরদারি অব্যাহত থাকবে। পুলিশের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক এবং সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। তিনি এ-ও জানিয়েছেন, সন্ধ্যার পর নির্জন স্থান, পরিত্যক্ত ভবন বা মাঠে কিশোরদের আড্ডা, মাদকসেবন বা অন্য কোনো সন্দেহজনক কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

