স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা হত্যার ৪ বছরেও হয়নি মামলা, আতঙ্কে পরিবার

স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা হত্যার ৪ বছরেও হয়নি মামলা, আতঙ্কে পরিবার
স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা জাকির হোসেন

কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলায় স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা জাকির হোসেন হত্যার চার বছর পার হলেও মামলা করতে পারছে না পরিবারের। এখনো চরম আতঙ্ক আর মানবেতর জীবনযাপন করছেন তারা।

বিজ্ঞাপন

জানা যায়, ২০২৩ সালের ৩০ অক্টোবর কুমিল্লার বুড়িচংয়ে পুলিশ ও আওয়ামী সন্ত্রাসীদের নির্যাতনে জাকির হোসেনের মৃত্যু হয়। ওই দিন ভোরে মোকাম এলাকায় নিজ বাড়ির পাশ থেকে তার লাশ উদ্ধার করে পরিবারের লোকজন। মৃত জাকির হোসেন উপজেলার মোকাম ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি ছিলেন।

ঘটনার সময় বুড়িচং থানার ওসি ছিলেন আবুল হাসনাত খন্দকার। সে সময় তিনি দাবি করেছিলেন, পুলিশ জাকিরকে না পেয়েই চলে এসেছে এবং পরিবারের পক্ষ থেকে তোলা হত্যার অভিযোগ সম্পূর্ণ অসত্য। একই বক্তব্য দিয়েছিলেন তৎকালীন পুলিশ সুপার আব্দুল মান্নান।

তবে পরিবারের অভিযোগ, সদর সার্কেলের তৎকালীন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কামরান হোসেন, ওসি আবুল হাসনাত খন্দকার, বুড়িচং থানার দেবপুর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ জাবেদ এবং এসআই রাজীবের নেতৃত্বে ওই অভিযান পরিচালিত হয়। তাদের নেতৃত্বেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। এ সময় স্থানীয় নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তাদের সহযোগিতা করেছিল।

সে সময় বুড়িচং দেবপুর ফাঁড়ির ইনচার্জ জাবেদ উল ইসলাম পুলিশের অভিযানের সত্যতা স্বীকার করে বলেছিলেন, রাতে জাকিরের বাড়িতে পুলিশের একটি দল গিয়েছিল তবে তাকে না পেয়ে ফিরে আসে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন জানান, তার হাতে হাতকড়ার দাগ ছিল এবং অণ্ডকোষ নষ্ট করে ফেলা হয়েছিল। এ ছাড়া তার চেহারা ও শরীরের বিভিন্ন অংশে স্পষ্ট আঘাতের চিহ্ন ছিল।

গত ১৫ সেপ্টেম্বর জাকির হোসেনের বাড়িতে গিয়ে কথা হয় প্রতিবেশী শাকিব হোসেনের সঙ্গে। যে স্থানটিতে জাকির হোসেনের মরদেহ ফেলে রাখা হয়েছিল, তা দেখিয়ে শাকিব বলেন, ওই দিন ভোরে মিজান কাকা নামাজের জন্য মসজিদে যাওয়ার সময় দেখেন জাকির মাটিতে পড়ে আছেন। তখন তিনি সবাইকে ডাকাডাকি করেন। আমরা সবাই মিলে তাকে ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক জানান তিনি বেঁচে নেই। ঘটনার তিন বছর হলেও জাকিরের পরিবার এখনো কোনো বিচার পায়নি।

যে ঘরটির পাশে জাকিরকে ফেলে রাখা হয়েছিল, সেই ঘরের মালিক মাজেদা খাতুন ভয় ও আতঙ্কে বলেন, তখন পুলিশ ও আওয়ামী লীগের ভয়ে জাকির নিচে লুকিয়ে থাকত। আমি কতবার তাকে এই অবস্থায় দেখেছি। কিন্তু যেদিন তাকে মেরে ফেলে রেখে যায়, সেদিন আমরা কোনো শব্দ শুনতে পাইনি। ফজরের সময় শুধু চিৎকার শুনতে পাই যে জাকিরকে মেরে ফেলে রাখা হয়েছে।

সরেজমিনে কথা হয় জাকির হোসেনের শাশুড়ি আনোয়ারা বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, মামলা করে কী হবে? আল্লাহ বিচার করবেন। আমার মেয়ে এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে খুব কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। এখন মামলা করলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আমার মেয়ে ও নাতিদের মেরে ফেলবে। অথচ বিএনপিও আমার মেয়ে এবং নাতিদের কোনো খোঁজখবর রাখছে না। তারা একটি ভাঙা ঘরে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে।

কেন মামলা করছেন না—এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাকির হোসেনের স্ত্রী আকলিমা আক্তার পলি বলেন, যখন আমার স্বামীকে হত্যা করা হয়, তখন আমি মামলা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু অনেকেই বলেছেন, মামলা করলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আমাকেও ছাড়বে না, কারণ আমার একটি ছোট ছেলে ও মেয়ে আছে। এই ভয়ে আমি তখন মামলা করতে পারিনি। তিন বছর হয়ে গেল, এখন মামলা করে আর কী হবে?

তিনি আরও বলেন, আমার স্বামী বিএনপির রাজনীতি করতেন। তিন বছর ধরে আমরা পরিবার নিয়ে অত্যন্ত কষ্টে আছি। ভাঙা একটি টিনের ঘরে বসবাস করছি। শুধু গত দুই ঈদে বিএনপির নেতারা খোঁজ নিয়েছিলেন, এরপর আর কেউ খোঁজ রাখেননি। আমার স্বামী দলের জন্য জীবন দিয়েছেন, অথচ আজ আমরা অনাহারে দিন কাটাচ্ছি।

উপজেলা মোকাম ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম বলেন, জাকির হোসেনকে হত্যার পর তার জানাজায় আমি বক্তব্য দিয়েছিলাম। এর দুই দিনের মাথায় আমাকেও গ্রেপ্তার করা হয়। পরিবার কেন এখনো মামলা করতে পারছে না, সে বিষয়ে জাকিরের স্ত্রীই ভালো বলতে পারবে।

এ বিষয়ে বুড়িচং থানার বর্তমান ওসি লুৎফুর রহমান বলেন, ঘটনাটি অনেক দিন আগের। বিষয়টি আপনার কাছ থেকেই শুনলাম। ভুক্তভোগী পরিবার যদি থানায় লিখিত অভিযোগ দেয়, তবে আমরা প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেব।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...