সন্তান ছেড়ে হাসপাতালে ভর্তি হননি মা, ডেঙ্গুতে ছাড়তে হলো পৃথিবীই

সন্তান ছেড়ে হাসপাতালে ভর্তি হননি মা, ডেঙ্গুতে ছাড়তে হলো পৃথিবীই

ভেজা পথের একপাশে সুদৃশ্য কাপড়ে ঢাকা খাটিয়া; ভেতরে নিথর শুয়ে আছেন মাত্র একুশ বছর বয়সি তরুণী মা জান্নাতুল মাওয়া সুমাইয়া। জানাজার জন্য সারিবদ্ধ হয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে আছেন স্বজন ও প্রতিবেশীরা। আর খাটিয়ার ঠিক সামনেই কালো ছাতার নিচে বাবা আবু তালেব নিশাদের কোলে চড়ে বিস্ময়ভরা চোখে সবার দিকে তাকিয়ে আছে দুই বছরের ছোট্ট শিশু আতিফ আবদুল্লাহ। অবুঝ শিশুটি এখনো জানেই না, সামনের ওই খাটিয়ার ভেতরেই চিরনিদ্রায় শায়িত তার পরম আদরের গর্ভধারিণী মা।

বিজ্ঞাপন

অথচ এই অবুঝ সন্তানকে ছেড়ে থাকতে হবে বলেই ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়ার পরও হাসপাতালে ভর্তি হতে চাননি সুমাইয়া। চিকিৎসকের স্পষ্ট পরামর্শ সত্ত্বেও কেবল বুকের ধনকে কাছে রাখতে নিজ বাড়িতে থেকেই চিকিৎসা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু যে সন্তানকে এক মুহূর্তের জন্য চোখের আড়াল করতে মন সায় দেয়নি, ডেঙ্গুর নিষ্ঠুর থাবায় সেই সন্তানকে পৃথিবীতে একা রেখেই না-ফেরার দেশে চলে যেতে হলো তাকে।

বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য স্পিডবোটযোগে সন্দ্বীপ থেকে চট্টগ্রামে নেওয়ার পথে সাগরেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন সুমাইয়া। পরে চট্টগ্রাম নগরের পার্কভিউ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

মৃত জান্নাতুল মাওয়া সুমাইয়া সন্দ্বীপ উপজেলার মাইটভাঙ্গা ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ও স্থানীয় একটি মাদরাসার শিক্ষক আবু তালেব নিশাদের স্ত্রী। তার বাবার বাড়ি একই ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডে। মাত্র একুশ বছর বয়সে সুমাইয়ার এমন আকস্মিক ও করুণ মৃত্যুতে পুরো এলাকায় মাতম চলছে। মাকে হারিয়ে অবুঝ শিশু আতিফের অবিরত কান্না থামাতে পারছেন না স্বজনেরা।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গত পাঁচ দিন ধরে তীব্র জ্বরে ভুগছিলেন সুমাইয়া। গত সোমবার পরীক্ষা করানো হলে তার ডেঙ্গু পজিটিভ আসে। সে সময় চিকিৎসক তাকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেন। তবে দুই বছরের শিশুর দেখাশোনার কথা চিন্তা করে তিনি বাড়িতে থেকেই চিকিৎসা নেওয়া শুরু করেন।

বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে হঠাৎ তার শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটলে দ্রুত স্থানীয় সন্দ্বীপ মেডিকেল সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়।

সন্দ্বীপ মেডিকেল সেন্টার সূত্রে জানা যায়, রোগীর অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন হওয়ায় এবং সন্দ্বীপে কোনো নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) ব্যবস্থা না থাকায় চিকিৎসকেরা তাকে তাৎক্ষণিক চট্টগ্রাম নগরে স্থানান্তরের পরামর্শ দেন। এরপর রাত আড়াইটার দিকে ঝুঁকি নিয়ে স্পিডবোটযোগে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা দেন স্বজনেরা। তবে উত্তাল নৌপথ পাড়ি দিয়ে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই নিভে যায় তার জীবনপ্রদীপ।

এদিকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে। সন্দ্বীপ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও স্থানীয় দুটি বেসরকারি হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ১৫ দিনে সন্দ্বীপে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা শতাধিক ছাড়িয়েছে।

সন্দ্বীপ উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মানস বিশ্বাস জানান, বর্তমানে সন্দ্বীপে মধ্যবয়স্ক ও শিশুদের মধ্যে ডেঙ্গুর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। গত সাত দিনে ডেঙ্গুর উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসা রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। জ্বর হলে অবহেলা না করে দ্রুত পরীক্ষা করানো এবং ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের শুরু থেকেই হাসপাতালে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখার ওপর জোর দেন তিনি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন