ভাঙছে না বড় সাজ্জাদ বাহিনীর ‘চেইন অব কমান্ড’, বদলাচ্ছে শুধু মুখ

ভাঙছে না বড় সাজ্জাদ বাহিনীর ‘চেইন অব কমান্ড’, বদলাচ্ছে শুধু মুখ
বড় সাজ্জাদ

চট্টগ্রামের অপরাধজগতে বড় সাজ্জাদের কথিত ‘চেইন অব কমান্ড’ ভাঙার বদলে একের পর এক বদলাচ্ছে নেতৃত্বের মুখ। শীর্ষ সহযোগীদের কেউ গ্রেপ্তার হলে কিংবা কারাগারে গেলে তার জায়গা নিচ্ছে পরের সারির আরেকজন। ছোট সাজ্জাদ কারাগারে যাওয়ার পর যেমন সামনে এসেছিলেন মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমন, তেমনি গত মাসে ইমনের গ্রেপ্তারের পর আলোচনায় এসেছে বোরহান উদ্দিনের নাম। তার পরের সম্ভাব্য নেতৃত্বের তালিকায় রয়েছেন রায়হান আলম।

পুলিশের ভাষ্য, বোরহান বড় সাজ্জাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। বাকলিয়ার জোড়া খুনের মামলায় তিনি এজাহারভুক্ত আসামি। তার বিরুদ্ধে অস্ত্র ও চাঁদাবাজিসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। ইমন গ্রেপ্তারের পর বড় সাজ্জাদের হয়ে নগর ও জেলায় অপরাধচক্রের কার্যক্রমে বোরহান কতটা সক্রিয় হন, তাতে নজর রাখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

বিজ্ঞাপন

পুলিশ বলছে, ইমন গ্রেপ্তারের পর ইতোমধ্যে ব্যবসায়ীর কাছে চাঁদা চেয়ে ভয়েস পাঠাচ্ছে বোরহান। সর্বশেষ গত সোমবার রাতে নগরীর পাঁচলাইশ থানার হামজারবাগ এলাকায় হাজী মোহাম্মদ ইউসুফের বাড়িতে চাঁদার জন্য গুলি চালানো হয়েছে। এছাড়া এক ব্যবসায়ীর কাছে চাঁদার দাবিতে এক ঘণ্টা সময় বেঁধে দিয়েছে।

এরই মধ্যে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে আরেকটি নাম— রায়হান আলম। বোরহান গ্রেপ্তার হলে পরবর্তী নেতৃত্বে রায়হানের নাম সামনে আসতে পারে বলে মনে করছেন তারা। ফলে একের পর এক শীর্ষ সহযোগী গ্রেপ্তার হলেও বড় সাজ্জাদের কথিত চক্রে নেতৃত্বের বিকল্প তৈরি থাকার বিষয়টিই এখন পুলিশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

ছোট সাজ্জাদের পর ইমনের উত্থান

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে কয়েক বছর এবং এর পরের কয়েক মাস চট্টগ্রামের অপরাধ জগতের একটি অংশে ছোট সাজ্জাদের প্রভাব ছিল বলে পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য। ২০২৫ সালের ১৫ মার্চ ঢাকায় গ্রেপ্তার হন সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ। এরপর তার জায়গায় উঠে আসেন ডেভিড ইমন ও রায়হান আলম। ইমন ও রায়হান বড় সাজ্জাদের হয়ে নগর ও জেলার পৃথক অংশে নেতৃত্ব দিতেন।

ইমনের উত্থান ছিল দ্রুত। ফটিকছড়ির কাঞ্চননগরের কৃষক পরিবারের সন্তান ইমন আগে ক্রিকেটের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অক্সিজেন এলাকায় ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে তার সক্রিয়তার কথা উঠে আসে। এরপর একাধিক হত্যাকাণ্ড ও চাঁদাবাজির অভিযোগে অপরাধজগতে তার নাম ছড়িয়ে পড়ে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়ায় জোড়া খুন এবং একই বছরের ২৩ মে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে ঢাকাইয়া আকবর হত্যার ঘটনায় ইমনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে জোড়া খুনসহ ১৮টি মামলার কথা জানিয়েছে পুলিশ।

গত জুলাইয়ের শেষদিকে যশোরের ধুমধুমপুর এলাকায় তিন সহযোগীসহ ইমনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পুলিশ জানায়, তারা ভারত যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। ইমনের কাছ থেকে একটি ভারতীয় আধার কার্ড পাওয়ার কথাও জানান চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম। পুলিশের দাবি, বড় সাজ্জাদের পরামর্শে ইমন দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা করেছিলেন।

জোড়া খুনে বোরহানের নাম

২০২৫ সালের ৩০ মার্চ রাতে বাকলিয়া এক্সেস রোডে একটি প্রাইভেট কার লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। এতে বখতিয়ার হোসেন মানিক ও মো. আবদুল্লাহ নিহত হন। এ ঘটনায় নিহত বখতিয়ারের মা ফিরোজা বেগম বাদী হয়ে মামলা করেন। এতে ছোট সাজ্জাদ, তার স্ত্রী, মোবারক হোসেন ইমন, রায়হান ও বোরহানসহ সাতজনকে আসামি করা হয়।

পুলিশের তদন্তে ওই হত্যাকাণ্ডের পেছনে আধিপত্য বিস্তার, ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ এবং বড় সাজ্জাদের প্রভাব ধরে রাখার মতো কয়েকটি কারণ উঠে আসে। ওই মামলায় বোরহানসহ কয়েকজনকে বড় সাজ্জাদের অনুসারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। অর্থাৎ বোরহান ছোট সাজ্জাদের সময় থেকেই তিনি ওই বলয়ের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে পুলিশের নজরে ছিলেন।

পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, ছোট সাজ্জাদ কারাগারে যাওয়ার পর বড় সাজ্জাদের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন রায়হান, বোরহান ও ইমন। মূলত রায়হানই ইমনকে বড় সাজ্জাদের দলে টানেন বলে পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে। ডেভিড ইমনের উত্থানের পেছনে রায়হানের ভূমিকার কথাও বলছে পুলিশ।

একের পর এক বদলাচ্ছে নেতৃত্ব

চট্টগ্রামের অপরাধ জগতে বড় সাজ্জাদ বাহিনীর নেতৃত্বের ইতিহাসেও এই হাতবদলের নজির আছে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় নূরনবী ম্যাক্সনকে ঘিরে বাহিনীর কার্যক্রম পরিচালিত হতো। পরে ঢাকাইয়া আকবর, সরোয়ার হোসেন বাবলা এবং এরপর ছোট সাজ্জাদের নাম সামনে আসে। ছোট সাজ্জাদ গ্রেপ্তারের পর ইমন ও রায়হান নেতৃত্বে আসেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ধারাবাহিকতায় ইমন গ্রেপ্তারের পর বোরহানের নাম সামনে আসা নতুন কোনো ঘটনা নয় বরং একই কাঠামোর পুনরাবৃত্তি বলে মনে করছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা।

পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, বড় সাজ্জাদের বাহিনীতে কয়েকটি স্তরে লোকজন কাজ করে। ফলে একজন শীর্ষ সহযোগী গ্রেপ্তার হলে পরের স্তরের কেউ দ্রুত তার জায়গা নেওয়ার সুযোগ পায়। এ কারণেই শুধু শীর্ষ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করলেই পুরো নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়বে না।

পুলিশের দাবি, বড় সাজ্জাদের পরামর্শে ইমন দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। ইমন গ্রেপ্তারের পর তার সঙ্গে যুক্ত নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে সমন্বিত অভিযান চালায়। কিন্তু ইমনের গ্রেপ্তারের পরই সামনে আসে বোরহানের নাম।

গোয়েন্দা সূত্রের পর্যবেক্ষণ, বোরহানের পর নেতৃত্বের সম্ভাব্য তালিকায় রয়েছেন রায়হান আলম। ইমনের সঙ্গে এরই মধ্যে নগর ও জেলার অপরাধ কর্মকাণ্ড ভাগ করে পরিচালনার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। চাঁদাবাজি, অস্ত্র ও হত্যাসহ একাধিক মামলায় তার নাম রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। রায়হানের বিরুদ্ধে অন্তত আটটি মামলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলমের দাবি, স্বল্প সময়ের ব্যবধানে একাধিক শীর্ষ সহযোগী গ্রেপ্তার হওয়ায় বড় সাজ্জাদ বাহিনীর ‘চেইন অব কমান্ড’ অনেকটাই ভেঙে পড়েছে। তিনি জানান, বাহিনীর সদস্যদের আর মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে দেওয়া হবে না এবং পলাতক অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন