লাকসাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে চলছে স্বাস্থ্যসেবা। পরিত্যক্ত কোয়ার্টারে প্রতিনিয়ত বসছে মাদকের আখড়া। ভবনের দেয়ালের বিভিন্ন অংশে দেখা দিয়েছে ফাটল। ছাদ থেকে খসে পড়ছে পলেস্তারা। দ্বিতীয় তলা ছাদবিশিষ্ট এ ভবনেই ঝুঁকিপূর্ণভাবে চলছে চিকিৎসাসেবা। আর কর্মকর্তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়েই রোগীদের সেই কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। একই হাসপাতালের আবাসিক কোয়ার্টারগুলো পরিত্যক্ত হয়েছে বহু আগেই। পরিত্যক্ত এসব কোয়ার্টারে দিন-রাত চলে মাদক আর অসামাজিক কার্যকলাপ। হাসপাতালের স্বাস্থ্য কর্মকর্তার আবাসিক কোয়ার্টারের একটি কক্ষ থেকে কিছুদিন আগে উদ্ধার করা হয়েছে যুবকের গলাকাটা লাশ। ইতোমধ্যে হাসপাতালটি ৫০ শয্যা থেকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করার কাজ চলছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজের কিছু অংশ রেখে পালিয়েছে।
জানা গেছে, কুমিল্লা জেলার লাকসাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কয়েকটি উপজেলার মধ্যে অন্যতম। এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পার্শ্ববর্তী লালমাই, নাঙ্গলকোট, মনোহরগঞ্জসহ আশপাশের উপজেলা থেকে শত শত রোগী সেবা নিতে আসেন। প্রতিদিন বহির্বিভাগে প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ রোগী সেবা নিতে আসেন। অথচ সেবার এ প্রতিষ্ঠানটি নিজেই নানা রোগব্যাধিতে আক্রান্ত। ১৯৬৫ সালে স্বাস্থ্য ও প্রকৌশল অধিদপ্তরের অর্থায়নে নির্মিত হয় লাকসাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য আবাসিক কোয়ার্টার। এ সব কোয়ার্টার গত কয়েক বছর আগেই ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এসব কোয়ার্টারের দরজা-জানালা, পানি ও গ্যাসের পাইপসহ প্রয়োজনীয় সব যন্ত্রপাতি চুরি হয়ে গেছে। কোয়ার্টারগুলোতে দিন-রাত মাদকসেবী ও অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। লাকসাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ২০ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও ডাক্তার, নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন নির্মাণ করা হয়নি।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি রোগীদের আবাসিক ভবনের ছাদের কয়েকটি স্থানে ফাটল ধরে খসে পড়ছে। একই ভবনের দেয়ালের চাপে জানালার গ্রীল বাঁকা হয়ে গেছে। যেকোনো সময় ভবনের চাদ বা দেয়াল ধসে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে।
আবাসিকে ভর্তিকৃত রোগীরা দুর্ঘটনার আশঙ্কার মাঝে সেবা নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। নারী রোগীদের ডেলিভারি কক্ষ, টয়লেটের দরজা-জানালা বহু আগেই ধসে পড়েছে। শিশু ওয়ার্ডের অবস্থাও নাজুক। এছাড়াও চাহিদামতো নেই ডাক্তার, নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারী। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রধান স্বাস্থ্য বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হলেও কোনো প্রতিকার নেই।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসা একাধিক রোগী জানায়, চিকিৎসা নিয়ে বাঁচতে এসে হাসপাতালের অবস্থা দেখে আতঙ্কে আছি। কখন ভবনের কোন অংশ ধসে পড়ে মারা যাই। ইতোমধ্যে ভবনের কয়েক স্থানের প্রলেপ খসে পড়ছে। এছাড়াও জরুরি কাজে টয়লেটে গেলে সামনে একজন দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। টয়লেটের নেই দরজা।
হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স মঞ্জুমা বেগম বলেন, হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের কি সেবা দিব, সারাক্ষণ অজানা আতঙ্কে থাকি, কখন হাসপাতাল ভবন বা কোন অংশ ধসে পড়ে নিহত বা আহত হয়ে বাসায় ফিরতে হয়। ডা. কামরুল হাসান রিয়াদ বলেন, আবাসিক মেডিকেল হাসপাতালের সমস্যার কোনো অন্ত নেই। চিকিৎসা বা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসনের কোনো ব্যবস্থা নেই। হাসপাতাল ভবন মেয়াদোত্তীর্ণ। ইতোমধ্যে ভবনের কয়েক স্থানে ফাটল ধরে খসে পড়ছে। যেকোনো সময় ভবন ধসে পড়ে রোগী বা হাসপাতালের কোনো ডাক্তার বা কর্মচারী আহত বা নিহত হতে পারে। স্বাস্থ্য বিভাগে সমস্যা নিয়ে জানানো হয়েছে। কোনো প্রতিকার নেই। এদিকে লাকসাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ৪০ শতক ভূমি জোরপূর্বক দখল করে রেখেছে প্রভাবশালী মহল। ভূমি দখলকারীদের উচ্ছেদ করার কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। কুমিল্লা আদালতে মামলা থাকলেও কাগজে কলমে সীমাবদ্ধ। এ হাসপাতালের এক কর্মচারী দীর্ঘদিন ধরে এখানে কর্মরত। হাসপাতালের ভূমি দখলকারীদের থেকে এ কর্মচারী উৎকোচ গ্রহণেরও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এদিকে হাসপাতাল ৫০ শয্যা থেকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করার কাজ শুরু হয়েছে। বহির্বিভাগ ও ডাক্তারদের আবাসিক কোয়ার্টারের কাজ চলমান অবস্থায় রেখে ঠিকাদার চলে গেছে। এসব বিষয়ে স্বাস্থ্য বিভাগকে অবহিত করা হয়েছে।
লাকসাম উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা ডা. নাজিয়া বিনতে আলম বলেন, লাকসাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বৃহত্তর লাকসামবাসীর স্বাস্থ্যসেবার প্রধান কেন্দ্র। এ অঞ্চলের মানুষের চিকিৎসাসেবার এ হাসপাতাল নিজেই নানা রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে আছে। মেয়াদোত্তীর্ণ ভবনে রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে নিজেই আতঙ্কে থাকি। কখন যে কোন অংশ ভেঙে বা ধসে পড়ে নিজে বা রোগী আহত বা নিহত হয়। কোয়ার্টারের দরজা বা জানালা সব চুরি হয়ে গেছে। ডাক্তার বা সেবিকারা নিয়মিত অজানা আতঙ্কের মধ্যে সেবা দিয়ে থাকেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

