আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

দুর্বৃত্তদের আগুনে ধ্বংসের মুখে ভাওয়ালের গজারি বন

এসএম জহিরুল ইসলাম, শ্রীপুর (গাজীপুর)

দুর্বৃত্তদের আগুনে ধ্বংসের মুখে ভাওয়ালের গজারি বন

গাজীপুরের শ্রীপুরে আবার দুর্বৃত্তদের দেওয়া আগুনে জ্বলছে ভাওয়ালের ঐতিহ্যবাহী গজারি বন। গত এক সপ্তাহ ধরে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বনভূমির ঝরা পাতায় আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে কপিচ গাছ, লতাগুল্ম ও বনাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্য। আগুনের তাপে ঝলসে যাচ্ছে উঁচু গাছের ডালপালা, ধ্বংস হচ্ছে বনের স্বাভাবিক পরিবেশ ও পুনরুৎপাদন ব্যবস্থা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিবছর ফাল্গুন-চৈত্র এলেই একই চিত্র দেখা যায়। গজারিগাছের ঝরা শুকনো পাতার স্তূপে পরিকল্পিতভাবে আগুন ধরিয়ে দেয় একশ্রেণির দুর্বৃত্ত। এতে বনভূমির নিচু স্তরের কপিচ, লতাগুল্ম পুড়ে যায়। নতুন করে জন্ম নেওয়া গজারির চারা দুই-তিন ফুট উঁচু হওয়ার পরই আগুনে নষ্ট হয়ে যায় । ফলে বন স্বাভাবিকভাবে পুনর্জন্ম নিতে পারছে না।

বিজ্ঞাপন

এলাকাবাসী জানান, আগুনে পোড়া কপিচ ও শুকনো কাঠ পরে লাকড়ি হিসেবে সংগ্রহ করে নিয়ে যায় কিছু অসাধু ব্যক্তি। বছরের পর বছর ধরে এভাবেই ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে ভাওয়ালের এ প্রাকৃতিক বনভূমি।

একজন স্থানীয় বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘প্রতি বছরই আগুন লাগে, কিন্তু কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখি না। বন বাঁচাতে হলে এখনই কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ অগ্নিসংযোগ শুধু গাছপালা নয়— পুরো বনজ সম্পদকে ধ্বংস করছে। আগুনে পোকামাকড়, কীটপতঙ্গ, উপকারী প্রাণী ধ্বংস হচ্ছে। মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিতে সহায়ক কেঁচো পুড়ে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বনের স্বাভাবিক পুনরুৎপাদন প্রক্রিয়া। মাটির ওপরের স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় নতুন করে গাছপালা জন্মাতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

একসময় ভাওয়ালের গজারি বন ছিল বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল। বাঘ, শিয়াল, বানর, হনুমান, সজারু, বনমোরগসহ নানা প্রাণীর বিচরণ ছিল এ বনে। কিন্তু বনভূমির গভীরতা কমে যাওয়া, আগুন ও মানবসৃষ্ট চাপ বৃদ্ধির ফলে সেই আবাসস্থল প্রায় বিলীন হয়ে গেছে। এখন আর দেখা মেলে না আগের সেই প্রাণচাঞ্চল্যের।

বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দল শ্রীপুর শাখার সভাপতি ও কলামিস্ট সাঈদ চৌধুরী বলেন, ‘বন পোড়ানো অত্যন্ত ক্ষতিকর। দ্রুত মাইকিংয়ের মাধ্যমে সচেতনতা বাড়াতে হবে। প্রয়োজনে স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ দিয়ে পাহারার ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু বন বিভাগের দৃশ্যমান তৎপরতা এখনো পর্যাপ্ত নয়। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে চলমান এ বন ধ্বংসের অপকর্ম বন্ধে নিয়মিত টহল, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে ভাওয়ালের শেষ গজারি বন।

নদী ও প্রকৃতি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম বলেন, ‘বনে আগুন লাগানো মানে পুরো জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করা। বন বিভাগকে জরুরি ভিত্তিতে নজরদারি বাড়াতে হবে, অন্যথায় যা অবশিষ্ট আছে তাও হারিয়ে যাবে।’

এ বিষয়ে শ্রীপুরের সহকারী বন সংরক্ষক ও রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. মোখলেচুর রহমান জানান, বন পোড়ানো বন্ধে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা রয়েছে। সচেতনতা বৃদ্ধিতে মাইকিং কার্যক্রম শুরু করা হবে। আগুন লাগার খবর পেলেই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে লোকবল সংকটের কারণে পুরো এলাকায় নজরদারি বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন