দুই সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা না দেওয়ার অভিযোগ

বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার পর সুস্থ হলো মুমূর্ষু শিশু

বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার পর সুস্থ হলো মুমূর্ষু শিশু
ছবি: আমার দেশ

১৩ মাস বয়সি শিশু মুন্তাসির হাসান। খাট থেকে পড়ে মাথায় আঘাত। এরপর শুরু হয় প্রচণ্ড বমি ও খিঁচুনি। সন্তানকে বাঁচাতে ছুটে যান বাবা। প্রথমে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট মানিকগঞ্জ সরকারি সদর হাসপাতাল, এরপর মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। কিন্তু দুই হাসপাতালের জরুরি বিভাগ থেকেই শিশুটিকে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা না দিয়ে অন্যত্র নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। একপর্যায়ে ঢাকায় নেওয়ার কথাও বলা হয়।

ততক্ষণে শিশুটির অবস্থা আরও সংকটাপন্ন। মুখ দিয়ে ফেনা বের হচ্ছিল, হচ্ছিল অসহনীয় খিঁচুনি। এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটতে ছুটতে কেটে যায় গুরুত্বপূর্ণ সময়। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে শিশুটিকে নেওয়া হয় মুন্নু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।

বিজ্ঞাপন

সেখানে জরুরি বিভাগে চিকিৎসা দেওয়ার পর প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যে শিশুটির জ্ঞান ফেরে বলে জানিয়েছেন তার বাবা।

ঘটনাটি গত ১ সেপ্টেম্বরের। সরকারি দুই হাসপাতালের জরুরি চিকিৎসাসেবা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ১৫ সেপ্টেম্বর খাদ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও মানিকগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্যের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন শিশুটির বাবা মাহমুদুল হাসান। তার বাড়ি মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার জাগীর ইউনিয়নের দেরগ্রাম এলাকায়।

অভিযোগে বলা হয়, ১ সেপ্টেম্বর ১৩ মাস বয়সি শিশু মুন্তাসির খাট থেকে মেঝেতে পড়ে যায়। মাথায় আঘাত পাওয়ার পর প্রচণ্ড বমি শুরু হয়। সন্তানকে নিয়ে দ্রুত মানিকগঞ্জ সরকারি সদর হাসপাতালে যান মাহমুদুল হাসান।

তার অভিযোগ, বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হলেও শিশুটিকে কোনো ধরনের চিকিৎসা না দিয়ে মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলা হয়।

সদর হাসপাতাল থেকে শিশুটিকে নিয়ে মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যান বাবা। সেখানেও দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক কোনো চিকিৎসা না দিয়ে শিশুটিকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন বলে অভিযোগ তার।

মাহমুদুল হাসানের ভাষ্য, শিশুটির মুখ দিয়ে ফেনা বের হতে থাকে। শুরু হয় তীব্র খিঁচুনি। একপর্যায়ে এমন অবস্থা তৈরি হয় যে, ঢাকায় নেওয়ার মতো সময়ও তাদের হাতে ছিল না।

এ অবস্থায় শিশুটিকে নিয়ে মুন্নু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান মাহমুদুল হাসান। তার অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক জয়ন্ত সাহা শিশুটির ওজন নির্ণয় করে প্রয়োজনীয় ইনজেকশন দেন।

চিকিৎসা দেওয়ার পর পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে শুরু করে। প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যে শিশুটির জ্ঞান ফিরে আসে এবং ধীরে ধীরে সে সুস্থ হয়ে ওঠে বলে জানান শিশুটির বাবা।

সন্তান সুস্থ হয়ে ওঠার পর চিকিৎসক জয়ন্ত সাহার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন বাবা মাহমুদুল হাসান। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শিশুটি সুস্থ হওয়ার পর তিনি মুন্নু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক জয়ন্ত সাহাকে একটি গোল্ড মেডেল উপহার দেন।

মাহমুদুল হাসানের ভাষ্য, সংকটাপন্ন অবস্থায় তার সন্তানকে জরুরি চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে তোলার ক্ষেত্রে চিকিৎসক জয়ন্ত সাহার ভূমিকার প্রতি কৃতজ্ঞতা থেকেই তিনি এই সম্মাননা দেন।

তার ভাষ্য, সরকারি দুটি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসার আশায় ঘুরতে গিয়ে মূল্যবান সময় চলে গেছে। শেষ পর্যন্ত বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে প্রয়োজনীয় জরুরি চিকিৎসা পাওয়ার পর শিশুটির জ্ঞান ফিরে আসে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, মানিকগঞ্জ সরকারি সদর হাসপাতাল ও মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ জেলার গুরুত্বপূর্ণ সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র। ফলে দুর্ঘটনা বা আকস্মিক অসুস্থতায় স্থানীয় মানুষের বড় একটি অংশ এসব প্রতিষ্ঠানের জরুরি বিভাগের ওপর নির্ভর করেন।

মাথায় আঘাত, খিঁচুনি, শ্বাসকষ্ট কিংবা অন্য কোনো সংকটাপন্ন অবস্থায় রোগীকে দ্রুত মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া জরুরি। সেখানে চিকিৎসা না পেলে রোগীকে অন্যত্র পাঠানোর ক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন মাহমুদুল হাসান। সরকারি দুই হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসা ব্যবস্থা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য খাদ্যমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানিয়েছেন তিনি।

এ বিষয়ে মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. শফিকুল ইসলামের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি।

জরুরি বিভাগে চিকিৎসা দেওয়া সেই ডাক্তার জয়ন্ত সাহা বলেন, ঐদিন বাচ্চাটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আমাদের এখানে আসে। পরে আমরা আমাদের সাধ্যমতো সর্বোচ্চ চিকিৎসার সেবা দেই। এতে বাচ্চাটা অনেকটাই সুস্থ হয়ে যায়। ডাক্তার হিসেবে আমরা আমাদের কর্তব্য পালন করেছি।

এ বিষয়ে মুন্নু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) জুলফিকার আহমেদ আমিন বলেন, ‘১ সেপ্টেম্বর অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি বাচ্চাকে নিয়ে আমাদের হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন। এখানে দায়িত্বরত ছিল ডাক্তার জয়ন্ত সাহা। তার চিকিৎসায় বাচ্চাটি সুস্থ হয়ে ওঠে।

এর আগে বাচ্চাটির পরিবার বিভিন্ন হাসপাতালে ঘোরাঘুরি করে কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেয়ে মুন্নু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসে। এখানে এসে তিনি কাঙ্ক্ষি সেবা পেয়ে আমাদের ডাক্তার জয়ন্ত সাহাকে একটি গোল্ড মেডেলও উপহার দেন। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের।’

এমএইচ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...