গাজীপুরের ভাওয়ালের ঐতিহ্যবাহী শাল-গজারি বনের বুক চিরে চলে গেছে দেশের অন্যতম ব্যস্ততম ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়ক। চার লেনের এ সড়কের মাঝখানের বিভাজকজুড়ে রয়েছে সাদা, গোলাপি ও লালচে রঙের হরেক রকমের ফুল। মহাসড়কের মাঝখানে থাকা এসব ফুল যেন পথচারী ও যাত্রীদের স্বাগত জানায় প্রকৃতির রঙিন রাজ্যে।
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক দিয়ে যাত্রাপথে চলন্ত পরিবহনের যাত্রীদের একঘেয়েমির ছন্দপতন ঘটে রাজেন্দ্রপুর এলাকায়। রাস্তার মাঝের বিভাজকজুড়ে বিভিন্ন রঙের ফুল ও তরুলতা দেখে দৃষ্টি জুড়ায় তাদের। প্রতিদিন হাজারো যানবাহনের চলাচলে ব্যস্ত এ সড়ক এখন শুধু যাতায়াত পথই নয়; হয়ে উঠেছে প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য সৌন্দর্যের ঠিকানা।
তপ্ত দুপুরের প্রচণ্ড তাপপ্রবাহ কিংবা পড়ন্ত বিকালের স্নিগ্ধ রোদে অথবা রাতের গভীর অন্ধকারে বিভিন্ন রকম ফুলের সৌন্দর্য অবলোকন করেন মহাসড়কের যাত্রীরা। প্রকৃতির এ সৌন্দর্য যাত্রীদের পাশাপাশি এলাকার জনসাধারণের মনের খোরাক জোগাচ্ছে প্রতিনিয়ত।
গাজীপুর সদর উপজেলার হোতাপাড়া এলাকা থেকে শুরু করে চান্দনা চৌরাস্তা পেরিয়ে শ্রীপুরের মাওনা চৌরাস্তা, গড়গড়িয়া নতুন বাজার, মাস্টারবাড়ি, নয়নপুর জৈনাবাজার এলাকায় মহাসড়কের বিভাজকে হরেক রকমের ফুল ফুটে থাকে। এসব ফুল এখন পথচারী, পরিবহনচালক ও যাত্রীদের দৃষ্টি কাড়ছে। অনেকেই গাড়ি থামিয়ে ফুলের সঙ্গে ছবি তুলছেন, আবার কেউ মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করছেন। মনোমুগ্ধকর এ দৃশ্য গাড়ির জানালা দিয়ে ক্যামেরাবন্দি করেন অনেক যাত্রী।
সরেজমিনে দেখা যায়, চান্দনা চৌরাস্তা থেকে মহাসড়ক ধরে কয়েক কিলোমিটার এগোলেই দুই পাশে চোখে পড়ে ভাওয়ালের সবুজ শাল-গজারি বন। মাঝেমধ্যে শিল্পকারখানা থাকলেও সড়ক বিভাজকে লাগানো ফুল ও সবুজ গাছপালা পুরো পরিবেশে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। লালচে-গোলাপি ও সাদা রঙের ফুলগুলো যেন পথচারী ও মহাসড়কের যাত্রীদের অভ্যর্থনা জানাচ্ছে। ফলে অনেকেই আকৃষ্ট হয়ে গাড়ি থামিয়ে কিছু সময় প্রকৃতির সান্নিধ্যে কাটাচ্ছেন।
চান্দনা চৌরাস্তা থেকে ময়মনসিংহ পর্যন্ত প্রায় ৯০ কিলোমিটার দীর্ঘ এ মহাসড়কের প্রায় ১৩ ফুট প্রশস্ত ডিভাইডারে সবুজ বৃক্ষরাজি ও বিভিন্ন প্রজাতির ফুলগাছ রোপণ করা হয়েছে। শহরের কোলাহল পেরিয়ে এ মহাসড়কে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে সবুজের সমারোহ আর ফুলের বর্ণিল ছটা; যা যাত্রীদের মনকে প্রশান্ত করে তোলে। শ্রীপুর উপজেলার বিভিন্ন অংশে এ সৌন্দর্য আরো বেশি নজর কাড়ছে এবং ধারাবাহিকভাবে ময়মনসিংহ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে এ সবুজ ও ফুলের শোভা।
মহাসড়কের বিভাজকে নীল কাঞ্চন, কামিনী, কৃষ্ণচূড়া, জোড়া টগর, রাধাচূড়া, অগ্নিশ্বর, পলাশ, গৌরীচূড়া, কনকচূড়া, কনকচাঁপা, কদম, কাঠবাদাম, জারুল ও রক্তকরবীসহ বিভিন্ন প্রজাতির ফুলগাছ রয়েছে। এসব গাছে বছরজুড়েই পর্যায়ক্রমে ফুল ফুটে থাকে। ফলে একেক ঋতুতে একেক রঙে সাজে মহাসড়কটি।
শ্রীপুর থেকে আসা শিক্ষার্থী সুমন মিয়া বলেন, ফেসবুকে এ ফুলের একটি ভিডিও দেখেছিলাম। তাই সরাসরি দেখতে এখানে এসেছি। বাস্তবে এসে দেখলাম, দৃশ্যটি আরো বেশি সুন্দর।
আরেক শিক্ষার্থী সাবিনা আক্তার বলেন, বন্ধুর মাধ্যমে ফুলের খবর পেয়ে কয়েকজন মিলে দেখতে এলাম। মনে হচ্ছে যেন বিদেশের কোনো সড়কে দাঁড়িয়ে আছি। পুরো মহাসড়ক এমন দৃশ্য থাকলে আরো ভালো লাগত।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ফুলের সৌন্দর্যের ভিডিও ও ছবি ভাইরাল হওয়ার পর প্রতিদিনই মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে মানুষের ভিড় বাড়ছে। অনেকেই ঝুঁকি নিয়ে সরাসরি মহাসড়কের আইল্যান্ড বা ডিভাইডারের ওপর উঠে ছবি ও ভিডিও ধারণ করছেন। কেউ কেউ আবার মহাসড়কের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বা বসে ছবি তুলছেন, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এতে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এছাড়া, কিছু অসচেতন দর্শনার্থী ফুলের সৌন্দর্য নষ্টও করছেন। অনেকেই গাছের ডালে উঠে ফুল সংগ্রহ করতে গিয়ে ডালপালা ভেঙে ফেলছেন, ফলে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে এবং সৌন্দর্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, মহাসড়কে এ ধরনের অনিয়ন্ত্রিত ভিড় ও ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ বন্ধে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে ট্রাফিক পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়িয়ে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দরকার। অন্যথায় যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
গাজীপুর সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মুহাম্মদ তারিক হাসান বলেন, মহাসড়ককে দৃষ্টিনন্দন ও পরিবেশবান্ধব করতে ডিভাইডারে বিভিন্ন প্রজাতির কয়েক হাজার চারা রোপণ করা হয়েছে। কোথাও দুই থেকে পাঁচ মিটার প্রস্থের জায়গায় তিন সারিতে এবং কোথাও এক থেকে দুই মিটার প্রস্থে এক সারিতে গাছ লাগানো হয়েছে। নিয়মিত পরিচর্যার মাধ্যমে এসব গাছের সৌন্দর্য রক্ষা করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, এ উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান ও আশপাশের বনাঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আরো সমৃদ্ধ হবে। পাশাপাশি ব্যস্ততম এ মহাসড়কটি ধীরে ধীরে প্রকৃতিপ্রেমী মানুষের কাছেও একটি আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হতে পারে।
পরিবেশবিদদের মতে, মহাসড়কের ডিভাইডারে লাগানো এসব গাছ এক লেনের গাড়ির হেডলাইটের আলো বিপরীত লেনের চালকদের চোখে সরাসরি পড়া থেকেও কিছুটা সুরক্ষা দেয়। পাশাপাশি ধুলাবালি ও শব্দদূষণ কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এ বিষয়ে নদী ও প্রকৃতি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম বলেন, মহাসড়কের বিভাজকে এ ধরনের সবুজায়ন ও ফুলের গাছ রোপণ পরিবেশ রক্ষার জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক উদ্যোগ। এটি শুধু সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে না, বরং বায়ুদূষণ কমানো, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে এ সৌন্দর্য রক্ষায় মানুষের সচেতনতা খুবই জরুরি।
প্রতিদিন হাজারো যানবাহনের চলাচলের মাঝেও ভাওয়ালের সবুজ বন আর ফুলে সাজানো এ মহাসড়ক যেন মনে করিয়ে দেয়—যান্ত্রিক জীবনের ভিড়েও প্রকৃতি তার সৌন্দর্যের রঙ ছড়িয়ে দিতে জানে। তবে এ সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়ে নিরাপত্তা ও পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি সমানভাবে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি বলে মনে করছে সচেতন মহল।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


ধর্মের শপথ নিয়ে অপরাধজগতে ভিড়ছে যুবকেরা
ন্যাটোর প্রতি ক্ষোভ ঝাড়লেন ট্রাম্প