নির্বাচন কমিশন চলতি বছরের নভেম্বর মাস থেকে সাত ধাপে ইউপি নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণার পর কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলায় বিএনপির রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করায় স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর শূন্যতা পূরণে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে চেয়ারম্যান প্রার্থী হওয়ার হিড়িক পড়ে গেছে। একদিকে দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের দৃশ্যমান সাংগঠনিক তৎপরতা অনেকটাই অনুপস্থিত। অন্যদিকে এই সুযোগকে নিজেদের রাজনৈতিক উত্থানের সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন বিএনপির স্থানীয় পর্যায়ের একাধিক নেতাকর্মী।
ফলে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা বেড়েছে। কোথাও ব্যানার-পোস্টার, কোথাও গণসংযোগ, আবার কোথাও সামাজিক ও রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিয়ে মনোনয়নপ্রত্যাশীরা মাঠ গরম করছেন।
স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ভাষায়, ‘আওয়ামী লীগ নেই’—এই ধারণাটিই এখন বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়িয়ে দিয়েছে। একটি ইউনিয়নে যেখানে একসময় একক প্রার্থী নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা, সেখানে একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশীর উপস্থিতিতে স্থানীয় বিএনপিতে কোন্দল বাড়ছে।
বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের অনেকেই মনে করছেন, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলীয় মনোনয়ন পেলে জয় পাওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে বেশি। এই হিসাব থেকেই অনেকেই আগেভাগে নিজেদের ‘প্রার্থী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছেন। ফলে একই ইউনিয়নে একাধিক প্রার্থীর ব্যানার-পোস্টার চোখে পড়ছে। চলছে নেতাকর্মী ও ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ, সামাজিক অনুষ্ঠানকেন্দ্রিক উপস্থিতি এবং নিজ নিজ সমর্থক বলয় শক্ত করার চেষ্টা। তবে এখানেই তৈরি হচ্ছে মূল ঝুঁকি।
মনোনয়ন পাওয়ার আগেই যদি প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ব্যক্তিগত বিরোধে রূপ নেয়, তাহলে চূড়ান্ত মনোনয়ন ঘোষণার পর দলীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
কারণ ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন জাতীয় নির্বাচনের মতো শুধু দলীয় প্রতীকের ওপর নির্ভরশীল নয়। এখানে প্রার্থীর ব্যক্তিগত পরিচিতি, পারিবারিক প্রভাব, সামাজিক সম্পর্ক, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, স্থানীয় জনপ্রিয়তা এবং দীর্ঘদিনের কর্মী-সমর্থক নেটওয়ার্ক বড় ভূমিকা রাখে।
বাজিতপুরের আগের স্থানীয় নির্বাচনগুলোর অভিজ্ঞতা দেখায়, দলীয় পরিচয় থাকলেই মাঠের সমীকরণ একতরফা হয় না। অতীতে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থীর পাশাপাশি বিদ্রোহী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতাও স্থানীয় নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে। হুমাইপুর ইউনিয়নের একটি নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর পাশাপাশি একাধিক স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।
উপজেলা পরিষদ নির্বাচনেও একাধিক আওয়ামী লীগ ঘরানার প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন এবং ফলাফলে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছিল।
গত জাতীয় নির্বাচন ঘিরেও বাজিতপুর-নিকলী আসনে বিএনপির মনোনয়নকে কেন্দ্র করে বিভক্তির অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে কয়েকজন নেতাকে বহিষ্কারের ঘটনাও ঘটেছে। এ অভিজ্ঞতা তাই ইউপি নির্বাচনের আগে স্থানীয় নেতৃত্বের জন্য নিছক অতীত নয়—এটি একটি রাজনৈতিক সতর্কসংকেত।
এ কারণেই স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, বিএনপির জন্য এবারের ইউপি নির্বাচন শুধু প্রতিপক্ষের সঙ্গে ভোটের লড়াই নয়; এটি অনেকাংশে নিজেদের ভেতরের ঐক্য ধরে রাখার পরীক্ষাও।
আওয়ামী লীগের দৃশ্যমান সাংগঠনিক তৎপরতা কম থাকলেও তাদের স্থানীয় পর্যায়ের সাবেক জনপ্রতিনিধি, সমর্থক ও ব্যক্তিগত যোগাযোগের নেটওয়ার্ক পুরোপুরি অকার্যকর—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও বাস্তবসম্মত নয়। ফলে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের জন্য অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসও ঝুঁকির কারণ হতে পারে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

