শীতলক্ষ্যা নদীতে দুর্ঘটনায় নিহত রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত ডুবুরি সাদিক হোসেন শুভ’র (২৬) লাশ নিজ জন্মস্থান রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন সম্পন্ন হয়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যায় জানাজা শেষে তাকে গোয়ালন্দ পৌর কেন্দ্রীয় কবরস্থানে দাফন করা হয়।
এদিন ছিল শোক আর কান্নায় ভরা এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। প্রিয় সন্তানের পদক বুকে নিয়ে বিলাপ করছিলেন সাদিকের মা। আহাজারি করে তিনি বলেন, আমার বুকের ধন, আমার চোখের মনি কোথায় চলে গেলি তুই! আমার সোনার ছেলে আর কোনোদিন আমাকে ‘মা’ বলে ডাকবে না। আমি কী নিয়ে বেঁচে থাকব?
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি আরও জানান, মৃত্যুর আগের দিন বৃহস্পতিবার সাদিক তার বাবার কাছে ফোন করে ৫ হাজার টাকা চেয়েছিল এবং কয়েকদিনের মধ্যেই বাড়ি আসার কথা জানিয়েছিল। তিনি ছেলের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনে সরকারের কাছে সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানান।
নিহত সাদিক হোসেন শুভ রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কুমড়াকান্দি গ্রামের মো. আশরাফ আলী শেখের ছেলে। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি মেজো। পেশাগত জীবনে তিনি নারায়ণগঞ্জ নদী ফায়ার স্টেশনের একজন দক্ষ ও প্রশিক্ষিত ডুবুরি ছিলেন। পানিতে ডুবে যাওয়া মানুষ উদ্ধারই ছিল তার প্রধান দায়িত্ব। দক্ষতার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ফায়ার সার্ভিসের রাষ্ট্রীয় পদক লাভ করেন।
পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন প্রতিভাবান ফুটবলার। গোলরক্ষক হিসেবে গোয়ালন্দ এলাকায় তার ব্যাপক পরিচিতি ছিল।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) সকাল ১১টার দিকে নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জ এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদীর ফায়ার ঘাটে পন্টুনের সামনে কচুরিপানা পরিষ্কার করার সময় স্পিডবোট থেকে পড়ে নিখোঁজ হন সাদিক। প্রায় ৮ ঘণ্টা তল্লাশির পর সন্ধ্যা ৭টার দিকে নারায়ণগঞ্জের কেরোসিন ঘাট এলাকা থেকে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা তার মরদেহ উদ্ধার করেন।
গোয়ালন্দ ফুটবল একাডেমির চেয়ারম্যান মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, সাদিক অত্যন্ত ভালো মানের গোলরক্ষক ছিলেন। গোয়ালন্দ ফুটবল একাডেমিসহ বিভিন্ন দলের হয়ে খেলেছেন। তিনি নম্র-ভদ্র ও সবার প্রিয় একজন মানুষ ছিলেন। তার অকাল মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত।
নিহতের চাচা ও গোয়ালন্দ পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর মো. ফজলুল হক জানান, দুর্ঘটনার সময় সাদিকসহ চারজন সদস্য কাজ করছিলেন। ঢেউয়ের কারণে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তিনি নদীতে পড়ে যান। দীর্ঘ সময় খোঁজাখুঁজির পর তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
তিনি বলেন, “সাদিক একজন দক্ষ ও রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত ডুবুরি। তার এভাবে ডুবে মৃত্যু হওয়া রহস্যজনক। আমরা সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি জানাচ্ছি।”
এদিকে, ঢাকা ফায়ার সার্ভিসের প্রধান কার্যালয়ে জুমার নামাজ শেষে প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে মরদেহ গোয়ালন্দে নিয়ে আসা হলে বিকেলে গেন্দু সরদার ঈদগাহ মাঠে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
জানাজা শেষে রাজবাড়ী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপ-সহকারী পরিচালক দেওয়ান সোহেল রানার নেতৃত্বে একদল অগ্নিনির্বাপক কর্মী তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রদান করেন এবং কফিনে ফুল দিয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানান।
সাদিকের মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। দুই বছর আগে বিয়ে করা সাদিকের স্ত্রীসহ পরিবার-পরিজন ও স্বজনদের মাঝে চলছে গভীর শোকের মাতম।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

