একসময় বর্ষা এলেই মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার খাল-বিল, নদী-নালা, ডোবা ও জলাবদ্ধ ফসলি মাঠ দেশীয় মাছের প্রাচুর্যে ভরে উঠত। শিং, মাগুর, কৈ, টেংরা, পুঁটি, খলিশা, টাকিসহ নানা প্রজাতির মাছ ছিল গ্রামীণ জনপদের স্বাভাবিক সম্পদ। কিন্তু অধিক লাভের আশায় বর্তমানে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় নিষিদ্ধ ‘চায়না দুয়ারি’ ও কারেন্ট জালের অবাধ ব্যবহারে সেই প্রাকৃতিক সম্পদ আজ ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়েছে। এসব জালে নির্বিচারে ধরা পড়ছে এক থেকে তিন ইঞ্চি আকারের পোনা মাছ, ডিমওয়ালা মা মাছসহ প্রায় সব ধরনের দেশীয় মাছ। ফলে ব্যাহত হচ্ছে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন, আর বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়ছে বহু দেশীয় প্রজাতি।
সম্প্রতি উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বর্ষার পানিতে প্লাবিত ধানক্ষেত, খাল, বিল ও জলাশয়ের পানির প্রবাহমুখে বাঁশ ও প্লাস্টিকের জাল দিয়ে তৈরি নিষিদ্ধ ‘চায়না দুয়ারি’ ফাঁদ বসানো হয়েছে। এসব ফাঁদে রুই, কাতলা, মৃগেল, শিং, মাগুর, কৈ, টেংরা, পুঁটি, খলিশাসহ অসংখ্য দেশীয় মাছের পাশাপাশি অতি ক্ষুদ্র পোনা ও ডিমওয়ালা মা মাছও আটকা পড়ছে। এতে মাছের প্রাকৃতিক বংশবিস্তার মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সরেজমিনে রাজৈর বাসস্ট্যান্ড ও টেকেরহাট মাছ বাজারে গিয়ে দেখা যায়, মাত্র এক থেকে তিন ইঞ্চি আকারের শৈল, টাকি, খলিশা, কৈ, শিং ও মাগুরসহ বিভিন্ন দেশীয় মাছ প্রকাশ্যেই বিক্রি হচ্ছে। অথচ এই মাছগুলো আরো কয়েক মাস বড় হওয়ার সুযোগ পেলে প্রজননের মাধ্যমে লাখ লাখ নতুন মাছের জন্ম দিতে পারত। অপরিণত অবস্থায় এসব মাছ বাজারজাত হওয়ায় দেশীয় মাছের ভবিষ্যৎ অস্তিত্ব নিয়েই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় জেলে ও বাসিন্দারা জানান, বর্ষা মৌসুমে অল্প পরিশ্রমে বেশি মাছ পাওয়ার আশায় অনেকেই নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার করছেন। এতে তাৎক্ষণিক লাভ হলেও দীর্ঘমেয়াদে ধ্বংস হচ্ছে দেশের মূল্যবান জলজ সম্পদ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মাছ ব্যবসায়ী বলেন, ‘বর্ষা এলেই অনেকেই চায়না দুয়ারি বসায়। এই জালে ছোট-বড় সব মাছ ধরা পড়ে। এভাবে চলতে থাকলে কয়েক বছরের মধ্যেই দেশীয় মাছ পাওয়া কঠিন হয়ে যাবে।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজৈর উপজেলার বিভিন্ন বাজারে বিক্রি হওয়া দেশীয় মাছের বড় একটি অংশ আসে বাজিতপুর, কদমবাড়ী, আমগ্রাম ও রাজৈর ইউনিয়নের বিভিন্ন বিল থেকে। এছাড়া পার্শ্ববর্তী গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া ও মুকসুদপুর উপজেলার বিভিন্ন বিল থেকেও বিপুল পরিমাণ দেশীয় মাছ রাজৈরের বাজারে আসে।
পরিবেশ সচেতন নাগরিকদের মতে, কোথায় এসব নিষিদ্ধ জাল তৈরি হচ্ছে, কারা বাজারজাত ও বিক্রি করছে এবং কারা ব্যবহার করছে—তাদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
মৎস্য সংরক্ষণ আইন, অনুযায়ী নিষিদ্ধ জাল ও ফাঁদ ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে জরিমানা, কারাদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান থাকলেও অধিক লাভের আশায় অনেকেই প্রকাশ্যে এই আইন অমান্য করছেন।
এ বিষয়ে রাজৈর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ও খামার ব্যবস্থাপক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) সাজ্জাদ হোসেন বলেন, দেশীয় মাছের প্রজনন ও জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় নিষিদ্ধ ‘চায়না দুয়ারি’ জালের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে উপজেলা মৎস্য অফিসে পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় প্রতিদিন অভিযান পরিচালনা সম্ভব হয় না। জনবল সংকট নিরসনে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে।
রাজৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রোখসানা খাইরুন নেছা বলেন, বিষয়টি উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করে জনবল সংকট থাকলেও আইন প্রয়োগ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়ানোর চেষ্টা করা হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

