ইমামতির পাশাপাশি চা-কফি বিক্রি, হালাল উপার্জনে জীবনসংগ্রাম হাবিবুল্লাহর

ইমামতির পাশাপাশি চা-কফি বিক্রি, হালাল উপার্জনে জীবনসংগ্রাম হাবিবুল্লাহর

এক হাতে চা-কফির ফ্লাস্ক, মুখের অধিকাংশই মাস্ক দিয়ে ঢাকা। মসজিদের ইমামতির সামান্য বেতনে সংসার চলে না, তাই হৃদয়ে হালাল উপার্জনের দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে প্রতিদিন পথে নামেন হাবিবুল্লাহ নামের এক যুবক।

বিজ্ঞাপন

ফরিদপুর জেলার বোয়ালমারী উপজেলার প্রধান বাজারসহ বিভিন্ন হাটবাজারে তাঁকে নিয়মিত দেখা যায়। কখনো বোয়ালমারী বাজারের হাসপাতালের গলি, কখনো চৌরাস্তা, রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড, মাছ বাজার, আবার কখনো থানা রোডের অলিগলিতে পথচারীদের কাছে গিয়ে চা-কফি বিক্রি করেন তিনি। অথচ তাঁর প্রধান পরিচয়—তিনি একজন মসজিদের ইমাম। ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সংসারের খরচ জোগাতে চা-কফি বিক্রি করে এক অদম্য জীবনসংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। যা প্রমাণ করে, কোনো সৎ কাজই ছোট নয় এবং পরিশ্রম কখনো অসম্মানের হতে পারে না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাগেরহাট থেকে এসে ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার শেখর ইউনিয়নে বসবাস করছেন এই যুবক। স্থানীয় একটি মসজিদে ইমামতি করলেও নামমাত্র সেই সম্মানী দিয়ে পরিবারের সব খরচ মেটানো তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। তাই সংসারের খরচ সামলাতে নামাজের এক ওয়াক্ত থেকে অন্য ওয়াক্তের মধ্যবর্তী সময়ে শেখর গ্রাম থেকে প্রায় ৬-৭ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তিনি চলে আসেন বোয়ালমারী পৌর সদরে। এরপর পায়ে হেঁটে মানুষের কাছে পৌঁছে দেন গরম চা ও কফি।

হাবিবুল্লাহর কাছে এই ফ্লাস্ক কেবল চা-কফি বিক্রির উপকরণ নয়; এটি তাঁর আত্মসম্মান, দায়িত্ববোধ ও পরিবারের জন্য নিরলস লড়াইয়ের প্রতীক। একদিকে মসজিদে ইমামতি করে মানুষকে ধর্মের পথে চলার আহ্বান জানান, অন্যদিকে নিজের জীবনেও সততা ও হালাল উপার্জনের সর্বোচ্চ আদর্শ ধারণ করে চলেছেন তিনি।

নিজের সংগ্রাম সম্পর্কে হাবিবুল্লাহ বলেন, ইমামতির সম্মানী দিয়ে সংসারের খরচ চালানো কঠিন। পরিবারের দায়িত্ব তো পালন করতেই হবে, তাই অবসর সময়ে চা-কফি বিক্রি করি। কোনো কাজই ছোট নয়, হালালভাবে উপার্জন করাটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় বিষয়। মানুষের কাছে হাত পাতার চেয়ে নিজের পরিশ্রমে উপার্জন করে পরিবার চালাতে চাই।

ইমামতির দায়িত্ব পালনে বিন্দুমাত্র অবহেলা না করে পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব কাঁধে নেওয়ার এই নিরলস প্রচেষ্টা ইতিমধ্যে স্থানীয় মানুষের নজর কেড়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. রুবেল বলেন, হাবিবুল্লাহর জীবনসংগ্রাম আমাদের জন্য একটি বড় শিক্ষা। একজন মসজিদের ইমাম হয়েও সংসার চালানোর জন্য পথে পথে চা-কফি বিক্রি করতে তাঁর কোনো দ্বিধা নেই। তিনি কারও কাছে হাত না পেতে নিজের শ্রম দিয়ে উপার্জন করছেন। তার এই সততা, আত্মসম্মান ও পরিশ্রম সত্যিই প্রশংসনীয়।

শাহ আলম নামের এক ব্যবসায়ী বলেন, সংসারের দায়িত্ব পালনের জন্য হাবিবুল্লাহ যেভাবে পরিশ্রম করছেন, তা আমাদের সবার জন্য অনুকরণীয়। পেশার মর্যাদা শুধু কাজের পরিচয়ে নয়, কাজটি কতটা সৎভাবে করা হচ্ছে, তার মধ্যেও নিহিত। একজন ইমাম হয়েও তিনি যেভাবে জীবিকা নির্বাহ করছেন—এটি লজ্জার নয়, বরং অত্যন্ত সম্মানের।

এদিকে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে একজন মসজিদের ইমামকে সংসার চালাতে এমন কঠিন সংগ্রামের মুখোমুখি হওয়া নিয়ে স্থানীয় বিশিষ্টজনরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই বাজারে মসজিদের ইমামদের যে সম্মানী দেওয়া হয়, তা দিয়ে জীবনযাপন করা অত্যন্ত দুরূহ। অনেকেই মনে করছেন, হয়তো সামাজিক সংকোচ বা নিজের পরিচয় আড়াল করতেই তিনি মাস্ক পরে চা বিক্রি করেন। ইমামদের উপযুক্ত বেতন বা সম্মানী নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট সমাজের বিত্তবান ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

হাবিবুল্লাহর এই গল্প কেবল একজন ইমামের চা-কফি বিক্রির গল্প নয়; এটি জীবনের প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করার এক বাস্তব উদাহরণ। যা আমাদের শেখায়—দায়িত্ব এড়িয়ে নয়, বরং দায়িত্বকে আপন করে নিয়েই মানুষ সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকতে পারে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন