আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ফরিদপুর-১

আ.লীগের ডামি প্রার্থী দোলন এবার স্বতন্ত্র

স্টাফ রিপোর্টার

আ.লীগের ডামি প্রার্থী দোলন এবার স্বতন্ত্র
আরিফুর রহমান দোলন

জুলাই বিপ্লবের পর কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রায় সব নেতা পালিয়ে গেলেও কয়েকজন এখনো দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি ও ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আরিফুর রহমান দোলন। ছাত্র-জনতা হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই ‘কেস পার্টনার’ ২০২৪ সালের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীক না পেয়ে ডামি প্রার্থী হিসেবে ভোটযুদ্ধে অংশ নেন। এবার তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। ইতোমধ্যে তিনি ফরিদপুর-১ (মধুখালী, বোয়ালমারী ও আলফাডাঙ্গা) আসন থেকে মনোনয়নপত্রও জমা দিয়েছেন।

জানা গেছে, দোলন ছাত্রজীবনেই আওয়ামী রাজনীতিতে জড়ান। ১৯৮৮ সালে তিনি ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা থানা ছাত্রলীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ছিলেন। এরপর ঢাকা কলেজের উত্তর ছাত্রাবাস শাখা ছাত্রলীগের সহসভাপতি ছিলেন। এমনকি কলকাতায় অবস্থানকালে ছাত্রলীগপন্থি সংগঠনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন।

বিজ্ঞাপন

হয়রানির শিকার হওয়ার ভয়ে নাম প্রকাশ না করে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, ঈগল প্রতীক নিয়ে ডামি নির্বাচনে জিততে না পারলেও ত্রয়োদশ সংসদের ভোট সামনে রেখে ব্যাপক প্রচার চালাচ্ছেন দোলন। নিজে রিটার্নিং কার্যালয়ে না গেলেও স্ত্রীর মাধ্যমে জমা দিয়েছেন মনোনয়নপত্র। তার বিরুদ্ধে জুলাই বিপ্লবে ছাত্র-জনতা হত্যা, মানিলন্ডারিং, অর্থ পাচারসহ একাধিক মামলা থাকলেও ঘুরে বেড়াচ্ছেন ফুরফুরে মেজাজে। তবে এসব মামলায় তিনি জামিন নিয়েছেন কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, জুলাই আন্দোলনে ছাত্র-জনতার ওপর বর্বরোচিত হামলা ও হত্যাকাণ্ড চালানোয় রাজধানীর গুলশান থানায় মো. সবুজ বাদী হয়ে শেখ হাসিনাকে প্রধান আসামি করে ৩১৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। এতে এজাহারভুক্ত ১৪ নম্বর আসামি দোলন। এ মামলায় কাউকে জামিন দেওয়া হয়েছে এমন কোনো রেকর্ড পাওয়া না গেলেও তাকে অদ্যাবধি গ্রেপ্তার করা হয়নি। একই মামলার ১৩ নম্বর আসামি সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন। তবে দোলন আছেন খোশ মেজাজে।

মামলাটিতে আসামির তালিকায় নাম আছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আবদুর রহমান, ফ্যাসিবাদী দলটির সভাপতিমণ্ডলীর আরেক সাবেক সদস্য ও আওয়ামী মন্ত্রী আমির হোসেন আমু, আওয়ামী লীগের সাবেক বাণিজ্য ও শিল্পবিষয়ক সম্পাদক লে. কর্নেল (অব.) ফারুক খান, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানকসহ ফ্যাসিবাদের দোসরদের সম্মুখ সারির প্রায় সবার। তারা সবাই পলাতক আছেন।

শেখ হাসিনার বেয়াই ও আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেনের ভাগনি জামাই হওয়ায় ফ্যাসিবাদী আমলে দোর্দণ্ড প্রতাপ নিয়ে এলাকায় রামরাজত্ব কায়েম করেছিলেন দোলন। জাতীয় রাজনীতিতেও তার ছিল বিশেষ প্রভাব। গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বের পরিচয় দিয়ে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন মিডিয়া পাড়াও।

জুলাই বিপ্লবের পর কিছুদিন আত্মগোপনে থাকলেও সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর প্রকাশ্যে আসেন দোলন। ফরিদপুর-১ আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের অ্যাকাউন্ট থেকে ঘোষণা দিয়ে প্রচারণা শুরু করেন। এতে সামাজিক মাধ্যমসহ ফরিদপুরের রাজনীতিতে সমালোচনার ঝড় ওঠে। গ্রেপ্তার করে শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ায় প্রশাসন ফ্যাসিবাদ পুনর্বাসন করছে বলেও অনেকে অভিযোগ করেন।

এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৭ ডিসেম্বর এই নির্বাচনি এলাকায় দোলনসহ ফ্যাসিবাদের সব দোসরকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ব্যানারে মশাল মিছিল বের হয়। মিছিল শেষে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বক্তারা দোলনকে অবিলম্বে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে বলেন, দোলন কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় নেতা এবং তিনি আওয়ামী মন্ত্রী মোশাররফের ভাগ্নি জামাই। এমনকি তিনি দেশজুড়ে আলোচিত ২ হাজার কোটি টাকা পাচারের মামলায় চার্জশিটভুক্ত আসামি। এত কিছুর পরও তাকে গ্রেপ্তার না করায় তিনি আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। বর্তমানে তিনি আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় ফেরানোর অপচেষ্টায় লিপ্ত আছেন।

২০২৪ সালের ৫ মার্চ দেশজুড়ে আলোচিত ২ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডির দায়ের করা মামলায় দোলনকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন ঢাকা মহানগরের জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ আস-সামছ জগলুল হোসেন। আগাম জামিনে থেকে ওই দিন আদালতে আত্মসমর্পণ করার পর তাকে জেলহাজতে পাঠানো হয়। পরে তিনি জামিনে মুক্তি পান।

দোলনের বিরুদ্ধে ফ্যাসিবাদ কায়েমে সহযোগিতা, আওয়ামী লীগ ফেরানোর চেষ্টা, লুটপাটের বহু অভিযোগ আছে। তার চরিত্র নিয়েও প্রশ্ন আছে সাধারণ মানুষের। ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে তার বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা করেছেন এক নারী।

কয়েকটি সূত্রে জানা যায়, কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় নেতা দোলন শুধু রাজনৈতিক নেতাই ছিলেন না, তিনি তার লেখনীর মাধ্যমেও ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠায় ঘৃণ্য ভূমিকা রেখেছেন। তিনি ‘অদম্য শেখ হাসিনা’ নামে একটি বইয়ের সম্পাদনা করে আওয়ামী লীগ সরকারের কাছ থেকে ব্যাপক সুবিধা নেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন