শীতের আগেই ভেজাল খেজুর গুড়ে সয়লাব বাজার

শীতের আগেই ভেজাল খেজুর গুড়ে সয়লাব বাজার

শীতের আগমনী বার্তা আসার আগেই ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে সয়লাব হয়ে গেছে ভেজাল খেজুর গুড়ের পাটালিতে। শীত আসতে এখনও দেরি থাকলেও এবং গাছিরা গাছ কাটা ও রস সংগ্রহের প্রস্তুতি না নিলেও একদল অসাধু ব্যবসায়ী রস ছাড়াই গোপনে তৈরি করছেন ভেজাল খেজুর গুড়। দেখতে অবিকল আসল গুড়ের মতো হলেও এতে বিপজ্জনক কেমিক্যাল ও উপাদান ব্যবহারের ফলে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন সাধারণ ক্রেতারা।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রতিবছর সদরপুরে খেজুর গাছের সংখ্যা কমলেও অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে ভেজাল গুড়ের উৎপাদন। উপজেলার আনাচে-কানাচে গড়ে উঠেছে অবৈধ কারখানা। সেখান থেকে ভেজাল গুড় তৈরি করে স্থানীয় হাটবাজারের পাশাপাশি প্রতিদিন পাঠানো হচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। এতে ঐতিহ্যবাহী ফরিদপুরের খেজুর গুড়ের সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক বাজারের ব্যবসায়ী জানান, এসব ভেজাল গুড় তৈরিতে ব্যবহার করা হচ্ছে অপরিশোধিত ভারতীয় চিনি, পুরাতন পচা গুড়, টেক্সটাইল কালার, আটা, চুন, রাসায়নিক এবং ক্ষতিকর ভেষজ নির্যাস।

অনুসন্ধানে জানা যায়, শীত এলেই সদরপুরের একশ্রেণির মৌসুমি ব্যবসায়ী কারিগর এনে কিংবা নিজেরাই কারখানা খুলে বসেন। রাতারাতি প্রতিটি কারখানায় ২০০ থেকে ৩০০ কেজি গুড় তৈরি করে বিভিন্ন হাট-বাজারে তা বিক্রি করা হয়। বিশেষ করে চন্দ্রপাড়া ও আটরশি দরবার শরিফের বিভিন্ন বার্ষিক ওরস ও মাহফিলকে কেন্দ্র করে এসব গুড় বেশি তৈরি করা হয় এবং চড়া দামে বিক্রি করা হয়।

উপজেলার সদর বাজার, সাড়ে সাতরশি বাজার ও পেঁয়াজখালী বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রকাশ্যে ডালায় সাজিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে এসব ভেজাল গুড়। প্রতি কেজি মাত্র ১৫০ টাকায় এই গুড় বিক্রি হওয়ায় কম দামে পেয়ে নিম্নবিত্ত ও অসচেতন ক্রেতারা না বুঝেই তা কিনে খাচ্ছেন। ফলে অজান্তেই তাঁরা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ছেন।

উপজেলার চরবিষ্ণুপুর ইউনিয়নের গাছি আজাদ হোসেন আক্ষেপ করে বলেন, আগে ফরিদপুরের নাম শুনলেই ক্রেতারা হুমড়ি খেয়ে গুড় কিনতেন। কিন্তু বর্তমানে ভেজালের কারণে মানুষ প্রতারিত হয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। এখন ভালো গুড় পেতে হলে গাছিদের সঙ্গে আগে থেকেই চুক্তি করতে হয়। ভেজাল গুড়ে ভেষজ নির্যাস মেশানোর কারণে আসলের চেয়ে এর ঘ্রাণ আরও বেশি মনে হয়। বাজারে এক কেজি আসল খেজুর গুড়ের দাম যেখানে প্রায় ৭০০ টাকা, সেখানে মাত্র ১৫০ টাকায় গুড় বিক্রির কথা শুনলেই বোঝা যায় এর মধ্যে ভেজাল রয়েছে।

এদিকে অভিযুক্ত কয়েকজন গুড় ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায় ভিন্ন তথ্য। তারা সাফাই গেয়ে বলেন, প্রাকৃতিক কারণে খেজুর গাছ কমে গেছে। এছাড়া গাছে আগের মতো পর্যাপ্ত রসও হয় না। রস ছাড়া তো আসল গুড় তৈরি করা সম্ভব নয়। তাই গুড়ের পরিমাণ বাড়াতে সামান্য রসের সাথে আমরা চিনি মেশাই। যখন রস থাকে না, তখন পুরাতন গুড়, চিনি ও কেমিক্যাল দিয়ে নতুন গুড় তৈরি করি। এতে অল্প টাকায় সাধারণ মানুষ গুড়ের স্বাদ পায়, আর আমরাও ব্যবসা চালাতে পারি।

এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. মোহা. সালাউদ্দিন বলেন, এসব কেমিক্যাল মিশ্রিত ভেজাল গুড় খেলে আলসার, ডায়রিয়া ও কলেরার মতো পেটের নানা জটিল রোগ দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে এসব গুড় দিয়ে শিশুদের খাবার তৈরি করে খাওয়ালে তাদের কিডনি, হৃদযন্ত্র, মস্তিষ্ক ও লিভার ক্যানসারের মতো মারাত্মক ও জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর সদরপুর উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মাহমুদুজ্জামান মিল্টন বলেন, জনস্বাস্থ্য রক্ষায় ভেজাল খেজুর গুড় তৈরি ও বাজারজাতকরণ দ্রুত বন্ধ করতে হবে। এ বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় অচিরেই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও ভেজাল গুড় কেনা থেকে বিরত থাকতে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন