নিয়োগের সময় বয়স গোপন, ভুয়া অভিজ্ঞতা সনদ ও শিক্ষাগত যোগ্যতা জালিয়াতিসহ বিশ্ববিদ্যালয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের গুরুতর দায়ে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুয়েট) ৫ জন শিক্ষক এবং ২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেট সভায় পূর্ণাঙ্গ তদন্তের ভিত্তিতে প্রশাসনিকভাবে এ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চাকরিচ্যুতদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত আইন অমান্য করা, নিয়োগের শর্ত ভঙ্গ, বয়সের বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন ও অস্তিত্বহীন গবেষণা নিবন্ধ ব্যবহারের মতো বেশ কয়েকটি গুরুতর অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। অভিযুক্ত সাতজনই দীর্ঘদিন ধরে কুয়েট থেকে সাময়িক বরখাস্ত (সাসপেন্ড) অবস্থায় ছিলেন।
চাকরিচ্যুত হওয়া শিক্ষকরা হলেন—কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের অধ্যাপক ড. পিন্টু চন্দ্র শীল, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট (আইইএম) বিভাগের অধ্যাপক ড. সুব্রত তলাপাত্র, এনার্জি সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (ইএসই) বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নিবিড় মণ্ডল, মানবিক ও ব্যবসায়িক শিক্ষা বিভাগের অধ্যাপক ড. মাসরুরা মোস্তফা এবং একই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শাহরিয়ার রোমান। এছাড়া চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা হলেন—বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার নিমাই চন্দ্র মিস্ত্রি এবং অফিস সহায়ক সত্যজিৎ কুমার দত্ত।
তদন্ত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সিএসই বিভাগের অধ্যাপক ড. পিন্টু চন্দ্র শীলের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই একাধিক অনিয়মের অভিযোগ ছিল। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর শিক্ষার্থীরা তার অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করলে কর্তৃপক্ষ তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে। সাময়িক বরখাস্ত থাকা অবস্থায় তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করেননি। অধিকন্তু, কুয়েট কর্তৃপক্ষের কোনো অনুমতি না নিয়েই তিনি দুটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় যুক্ত হন এবং ওই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওয়েবসাইটে তার নাম পাওয়া যায়। এসব শৃঙ্খলাভঙ্গের অপরাধে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়।
আইইএম বিভাগের অধ্যাপক ড. সুব্রত তলাপাত্র ২০১০ সালের ২০ অক্টোবর কুয়েটে প্রভাষক পদে যোগ দেন। তদন্তে দেখা যায়, আবেদনের সময়ই তার বয়স কুয়েটের নির্ধারিত আইন অনুযায়ী ৩০ বছরের বেশি ছিল, যা তৎকালীন নিয়োগ শর্তের সরাসরি লঙ্ঘন।
মানবিক ও ব্যবসায়িক শিক্ষা বিভাগের অধ্যাপক ড. মাসরুরা মোস্তফার বিরুদ্ধে জোড়া জালিয়াতির প্রমাণ মিলেছে। তিনি নির্ধারিত বয়সসীমা (৩০ বছর) পার হওয়ার পর প্রভাষক হিসেবে আবেদন করেছিলেন। পরবর্তীতে সহকারী অধ্যাপক পদে উন্নীত হওয়ার সময় তিনি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরির অভিজ্ঞতা ব্যবহার করেন, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত নীতিমালায় গ্রহণযোগ্য নয়।
একই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শাহরিয়ার রোমানের বিরুদ্ধে জালিয়াতির তথ্য উঠে এসেছে। প্রভাষক পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্তানুসারে অনার্স ও মাস্টার্স উভয় পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণি থাকা বাধ্যতামূলক হলেও তিনি দুটিতেই দ্বিতীয় শ্রেণি পেয়েছিলেন। জালিয়াতি ও তথ্য গোপনের মাধ্যমে তিনি নিয়োগ পান। শুধু তা-ই নয়, সহকারী অধ্যাপক পদে আবেদনপত্রে তিনি দুটি ‘গবেষণা নিবন্ধ’-এর উল্লেখ করেছিলেন, যা পরবর্তীতে তদন্তে সম্পূর্ণ অস্তিত্বহীন ও ভুয়া হিসেবে প্রমাণিত হয়।
ইএসই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নিবিড় মণ্ডল যোগদানের সময় কুয়েটের নীতিবহির্ভূতভাবে একটি প্রকল্পের অভিজ্ঞতা ব্যবহার করেছিলেন। পরবর্তীতে সাময়িক বরখাস্ত থাকা অবস্থায় কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে বিদেশে গেলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দেশে ফেরেননি এবং কর্মস্থলে আর যোগদান করেননি।
এদিকে প্রশাসনিক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ডেপুটি রেজিস্ট্রার নিমাই চন্দ্র মিস্ত্রি সেকশন অফিসার পদে নিয়োগের সময় মিথ্যা ও বানোয়াট অভিজ্ঞতার সনদ দাখিল করেছিলেন। আর অফিস সহায়ক সত্যজিৎ কুমার দত্ত জাতীয় পরিচয়পত্রে (এনআইডি) বয়স কমিয়ে জালিয়াতির মাধ্যমে কুয়েটে চাকরি নিয়েছিলেন।
এ প্রসঙ্গে কুয়েটের রেজিস্ট্রার প্রকৌশলী মো. আনিছুর রহমান ভূঞা জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১৫তম সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত অনুসারেই তাদের বিরুদ্ধে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে পূর্ব থেকেই একাধিক অনিয়মের সত্যতা ছিল, যার কারণে তাদের বরখাস্ত করা হয়। পরবর্তীতে গঠিত তদন্ত কমিটির নিরপেক্ষ অনুসন্ধান ও অভিযুক্তদের কাছ থেকে কৈফিয়ত ও ব্যাখ্যা তলব শেষে অভিযোগ চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হওয়ায় তাদের চাকরিচ্যুত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

