উন্নত জীবনের আশায় লিবিয়ায় গিয়ে এখন পরিবার থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন যশোরের শার্শা উপজেলার পাঁচ যুবক। ভালো বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে আনোয়ার হোসেন, ইয়াসিন আরাফাত, রিহান আলী, শাহিন আলম ও রানা হোসেন—প্রত্যেকের কাছ থেকে প্রায় ১০ লাখ টাকা করে নিয়ে তাদের লিবিয়ায় পাঠানো হয়েছিল। স্থানীয় মফিজুর রহমান লিবিয়ায় থাকা তার ছেলে সোহাগের মাধ্যমে ২০২২ ও ২০২৩ সালে ওই পাঁচ যুবককে লিবিয়ায় পাঠান।
প্রথম দিকে পরিবারের সঙ্গে ওই পাঁচ যুবকের নিয়মিত যোগাযোগ থাকলেও ২০২৪ সালের জুনের পর থেকে হঠাৎ করেই যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘদিন পর গত ১ জুলাই একজন যুবকের ফোনে আনোয়ারের পরিবারের কাছে আসে ভয়াবহ তথ্য। তাদের লিবিয়ার একটি দুর্গম জিপসাম খনিতে জোর করে শ্রম দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালে মাফিয়া চক্রের লোকজন দিয়ে মারধর করা হচ্ছে।
এমন অভিযোগ এনে যশোরের ‘মানব পাচার ও অভিবাসী অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল ২’-এ মামলা করেছেন ভুক্তভোগী আনোয়ারের বাবা মোশিয়ার রহমান। মামলায় মফিজুর রহমান, তার স্ত্রী মমতাজ বেগম, মেয়ে রুমা খাতুন, ছেলে সোহাগ ও সোহাগের স্ত্রী পিয়া খাতুনকে আসামি করা হয়েছে।
মোশিয়ার রহমানের অভিযোগ, মফিজুর রহমান ২০২২ সালে তাকে জানান, তার ছেলে সোহাগ লিবিয়ায় অবস্থান করছেন এবং বাংলাদেশ থেকে বেকার যুবকদের লিবিয়ায় নিয়ে ভালো চাকরিতে নিয়োগের ব্যবস্থা করেছেন। তার ছেলে আনোয়ার লিবিয়ায় গেলে মাসে প্রায় ৭০ হাজার টাকা বেতন পাওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়।
পরে ২০২২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি মফিজুর রহমানকে ১০ লাখ টাকা দেওয়া হয়। আনোয়ারকে ২০২২ সালের ২৫ মার্চ ঢাকা বিমানবন্দর দিয়ে লিবিয়ায় পাঠানো হয়। লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর সোহাগ আনোয়ারকে বিমানবন্দর থেকে গ্রহণ করেন এবং দেশটির আল ছিদ্রা এলাকার একটি জিপসাম খনিতে কাজ দেন। একইভাবে আরো ১০ লাখ টাকা নিয়ে চার যুবককে লিবিয়ায় পাঠানো হয়।
অভিযোগে বলা হয়েছে, পাঁচ যুবককেই লিবিয়ায় নিয়ে যাওয়ার পর সোহাগ বিমানবন্দর থেকে গ্রহণ করেন এবং তাদের আল ছিদ্রা এলাকার জিপসাম খনিতে কাজে লাগানো হয়।
মামলার নথিতে বলা হয়েছে, লিবিয়ায় অবস্থানকালে পাঁচ যুবক ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত নিজ নিজ পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। তারা পরিবারকে জানাতেন, আল ছিদ্রা এলাকার জিপসাম খনিতে তারা কাজ করছেন।
কিন্তু ২০২৪ সালের জুনের পর একে একে তাদের সবার সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। প্রথমে পরিবারের সদস্যরা বিষয়টিকে সাময়িক সমস্যা মনে করলেও সময় যত গড়াতে থাকে, উৎকণ্ঠা তত বাড়তে থাকে। ২০২৫ সালের জুনের পর পরিবারের সদস্যরা অভিযুক্তদের কাছে তাদের সন্তানদের বিষয়ে জানতে চাইলে নানা অজুহাতে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্তও তাদের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
বাদীর অভিযোগ, আনোয়ার ফোনে জানান, তিনি, ইয়াসিন, রিহান, শাহিন ও রানা চরম বিপদের মধ্যে রয়েছেন। তাদের আল ছিদ্রা এলাকার খনি থেকে সরিয়ে লিবিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বেনগাজি শহরের পূর্বদিকে অবস্থিত আল রাজমা এলাকার একটি জিপসাম খনিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেখানে তাদের জোরপূর্বক ও দাসত্বমূলক শ্রমে বাধ্য করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তারা কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালে সোহাগ লিবিয়ার মাফিয়া চক্রের লোকজনকে দিয়ে তাদের মারধর করান, এমন অভিযোগও করা হয়েছে।
একদিকে সন্তানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারার উৎকণ্ঠা, অন্যদিকে বিদেশে পাঠানোর জন্য করা ঋণের বোঝা—সব মিলিয়ে পরিবারগুলো এখন চরম অসহায় অবস্থায় রয়েছে। শার্শা থানার ওসি শামিনুল হক বলেন, ‘ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। ঘটনার সত্যতা যাচাই, নিখোঁজ যুবকদের অবস্থান শনাক্ত এবং ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

