বায়ান্নর ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় গুলিবর্ষণে হতাহতের ঘটনার দুইদিন পরে খুলনায় বিক্ষোভ মিছিল করেছিলেন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রীরা। তাদের সংগঠিত করা আর মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্বভার কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন বেগম মাজেদা আলী। এ অপরাধে তাকে কয়েকদিন হোস্টেল ছেড়ে পালিয়েও থাকতে হয়েছিল।
একজন শিক্ষাবিদ, সমাজসেবী ও নারী সংগঠক হিসেবে খ্যাত ৯০ বছর ছুঁই ছুঁই এই মহীয়সী নারী জীবনের পড়ন্ত বেলায় এখনো আলো ছড়ান সমাজে। আর তাই বিশেষ দিবসকে কেন্দ্র করে খুলনার কবি, সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, সমাজকর্মী, নারী নেত্রীরা এসে জড়ো হন তার বাসভবনে। সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে চলে আড্ডা, গল্প, স্মৃতিচারণ, কবিতা পাঠ।
গতকাল শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) সকালে নগরীর ফরাজি পাড়ায় অমর একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে এমনই এক আয়োজনে ফুলেল শুভেচ্ছায় সিক্ত করা হয় এই ভাষাসৈনিককে। বয়সের ভারে আর নানা রোগে আক্রান্ত শরীর, স্মৃতিশক্তিও কমেছে বেশ। দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন অনেক আগে। চলাফেরার গতি শ্লথ। অনেক কিছু ভুলে যান, আবার নিকটজনেরা ধরিয়ে দিলে মনে পড়ে। তখন গড়গড় করে বলতে থাকেন জীবনের নানা পর্যায়ের কাহিনিগুলো।
সে সময় মেয়েদের লেখাপড়ায় সমাজের নানা বাধা ছিল। বাড়িতে বসে পড়ার ক্ষেত্রে প্রতিবেশীদের প্রতিবন্ধকতা থাকায় হোস্টেলে থেকেছেন তিনি। ছাত্রী সংগঠক হিসেবে নিজেকে দাঁড় করানোর গল্পে বেগম মাজেদা আলী বলেন, ‘বাবা গেলেন বিএল কলেজে আইএ ভর্তি করার জন্য। বিএল কলেজের অধ্যক্ষ বললেন, এখানে ছেলেরা পড়াশোনা করে। আপনি করোনেশন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে আর কে কলেজে যোগাযোগ করেন। ওখানে মেয়েরা পড়াশোনা করে। যোগাযোগ করা হলো আর কে কলেজের অধ্যক্ষ অমূল্য ধন সিংহের সঙ্গে। তিনি কলেজে ভর্তি করলেন। কিন্তু প্রতিদিন দৌলতপুর থেকে ট্রেনে করে মাধ্যমিকে ক্লাস করা সম্ভব নয়। সামাজিক ও পারিবারিক অনেক চাপ আছে। তাই করোনেশন বালিকা বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ মিস সুফিয়া বেগম বিদ্যালয়ে নারী হোস্টেলে থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন। কমরেড শচীন বসুর স্ত্রী অনুপমা বসুর সহযোগিতায় রেলওয়ে বালিকা বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করারও সুযোগ হলো। অনুপমা দিদির হাত ধরেই তখন আস্তে আস্তে রাজনীতির সঙ্গে যোগাযোগ হলো আমার। ১৯৫২ সালের জানুয়ারি মাসে ড. সানজিদা খাতুন ঢাকা থেকে চিঠি দিলেন খুলনায় ছাত্রী সংসদ গঠনের। ১১ সদস্যের একটি ছাত্রী সংসদ গঠন করা হলো খুলনায়।
ভাষা আন্দোলনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘১৯৫২ এর ২১ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার দিকে বিদ্যালয় থেকে ফেরার সময় দেখলাম গাজী শহীদুল্লাহ, আবু মোহাম্মদ ফেরদাউস, মিজানুর রহিম, নুরুল ইসলাম দাদু, মালিক আতাহারসহ কয়েকজন ছাত্রনেতা কলেজ গেটে দাঁড়ানো। তখনো আমি জানি না ঢাকায় ২১ ফেব্রুয়ারির মিছিলে গুলি হয়েছে। রফিক, জব্বারসহ অনেক ছাত্রনেতা ও সাধারণ জনতা নিহত হয়েছেন। তাদের কাছ থেকেই প্রথম শুনলাম এ ঘটনা। তারা বললেন আপনারা ছাত্রী সংগঠনের পক্ষ থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করবেন। সব সহযোগিতা আমরা করব। আর শনিবার করোনেশন বালিকা বিদ্যালয়, রেলওয়ে বালিকা বিদ্যালয়, আর কে কলেজ ও হামিদ আলী বালিকা বিদ্যালয় বন্ধ করে দিতে হবে।’
‘ছাত্রনেতারা লাঠিসোটা, কাগজ, কালি ও চাটাইয়ের ব্যবস্থা করলেন পোস্টার ও ফেস্টুন বানানোর জন্য। সারা রাত বসে ফেস্টুন ও পোস্টার বানিয়ে ভোরে হোস্টেলের বাথরুমের পাশে ছোট গেট দিয়ে মেয়েরা বাইরে বের হলো। অন্যান্য বিদ্যালয়ের মেয়েরাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করল মিছিলে। শত শত মেয়ে সেদিন মিছিলে ছিল। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ডা. অতুলেন্দ্র দাসের তিন মেয়ে রত্না, খুকু ও ঝঞ্ঝা, ডা. মাহবুবের স্ত্রী রোকেয়া বেগম শিরী প্রমুখ।
মিছিলটি করোনেশন মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে বের হয়ে নিলা হল বর্তমান পিকচার প্যালেস হলের সামনে থেকে থানা হয়ে, ডিসি অফিসের সামনে দিয়ে সার্কেট হাউস ঘুরে মহেন্দ্র হীল নারী পার্কে এসে শেষ হয়। এটিই ছিল ভাষা আন্দোলনে নারীদের প্রথম মিছিল খুলনায়।
বেগম মাজেদা আলী জানান, ‘মিছিলের পরপরই শুরু হয় তাদের ওপর চাপ। রোববার সকালে কলেজের প্রিন্সিপাল অমূল্য ধন সিংহ তাকে রুমে ডেকে পাঠান। ভয়ে ভয়ে অধ্যক্ষের রুমে গেলে স্যার তাকে দেখে বলেন, তোমাকে আমি বকা ঝকা করতে ডাকিনি। তুমি একটি সাহসী কাজ করেছ। আমি তোমার প্রশংসা করছি। কিন্তু তোমাকে কয়েকদিন গা-ঢাকা দিয়ে থাকতে হবে। তখন আসলে আমি গা-ঢাকা কি বুঝিনি।
স্যার কিছুক্ষণ পরে বললেন, ‘গা-ঢাকা মানে হচ্ছে তুমি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতে পারবা না। হোস্টেলে বা বাড়িতে থাকতে পারবে না। কলেজেও ক্লাস করতে পারবা না। কয়েকদিন একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসো।’ আমি তখন অল্প বয়স, কে আমাকে থাকতে দেবে। এই ভেবে খুব দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলাম। পরে মুন্সিপাড়া এক আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়ে উঠলাম।
ভাষাসৈনিক বেগম মাজেদা আলী ১৯৩৬ সালের ২৮ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। বাবা মরহুম শেখ আব্দুল জব্বার এবং মা মোসাম্মৎ দৌলত উন নেসা। ১১ ভাই বোনের সবার বড় ছিলেন তিনি। ১৯৫১ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন করোনেশন মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে। ১৯৫৩ সালে আর কে কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন । ১৯৬৭ সালে এমএ পাস করেন। ১৯৬৯ সালে বিনা বেতনে সুন্দরবন কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন তিনি। তিনি এই কলেজের উপাধ্যক্ষ ছিলেন।
১৯৫৩ সালে অ্যাডভোকেট শেখ রাজ্জাক আলীর সঙ্গে তার বিয়ে হয়। রাজ্জাক আলী পরবর্তীকালে জাতীয় সংসদের স্পিকার হন। সংসার জীবনে তিনি চার কন্যা সন্তানের মা। চার সন্তানের সবাই প্রতিষ্ঠিত।
বেগম মাজেদা আলী খুলনা মহিলা সমিতি, মহিলা সমবায় সমিতি, দুঃস্থ নারী পুনর্বাসন কেন্দ্র, বনফুল মহিলা ও শিশু কল্যাণ সমিতি, গার্ল গাইডস সমিতি, লেখিকা সংঘ, জাতীয় যক্ষ্মা নিরোধ সমিতি, জাতীয় সমাজ কল্যাণ পরিষদসহ নারী জাগরণের বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তিনি একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

