ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে তাল ও খেজুর গাছে ঝুলছে বাবুই পাখির বাসা। নিপুণভাবে তৈরি করছে বাবুই পাখি এসব বাসা। এসব বাবুই পাখির বাসা বাতাসে দোল খাচ্ছে। এতে প্রকৃতির সৌন্দর্য আরো এক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ঝিনাইদহ কালীগঞ্জ উপজেলার কোলা ইউনিয়নের কামালহাট গ্রামের জনপদে সারিবদ্ধ তালগাছের পাতায় পাতায় দোল খাচ্ছে বাবুই পাখির বাসা।
জানা গেছে, বাসা বাঁধতে তালগাছ বাবুই পাখির পছন্দ। কারণ তালের পাতা শক্ত হওয়ায় সুন্দরভাবে বাসা তৈরি করে, বাতাসে হেলেদুলে ও বৃষ্টিতে ভিজে বাসা মাটিতে সহজে পড়ে না। বাবুই পাখি তাল গাছে বাসা তৈরি করেছে খেজুর পাতা, নারিকেল পাতা দিয়ে। গাছ থেকে সুন্দর করে পাতা ছিঁড়ে নিয়ে নিখুঁতভাবে বাবুই পাখি বাসা তৈরি করে। বাসা দেখতে অপূর্ব সুন্দর ও ঝড়, বৃষ্টিতে টিকে থাকার মতো শক্ত। এত সুন্দর বাসা বাবুই পাখিই বানাতে পারে, অন্য কারো দ্বারা কখনো সম্ভব নয়।
বাবুই পাখির বাসা অধিকাংশই একতলা ও দুতলা করে তৈরি করে বাচ্চাসহ বসবাস করে থাকে। পুরুষ বাবুই পাখি থাকার বাসা আলাদাভাবে তৈরি করে। বাবুই পাখি ডিমে তা দিয়ে বাচ্চা ফুটিয়ে থাকে। প্রতিটি বাবুই পাখির বাসায় ও বাচ্চাকে রাতের আধারে দেখার জন্য জোনাকি পোকার মিটি মিটি আলো ব্যবহার করে থাকে। বাবুই পাখি আলোর জন্য বাসার এক কোণে কাদামাটি এনে রাখে। বাবুই পাখি জোনাকি পোকা ধরে বাসার কাদামাটিতে বসিয়ে রাখে। কাদামাটিতে জোনাকি পোকা এমনভাবে রাখে যেন না যেতে পারে। বাবুই পাখির বাসায় রাতের আধারে বাচ্চাকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য জোনাকি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
চমৎকার বুননে ঝুড়ির মতো বাসা তৈরির জন্য পাখিটি সুপরিচিত। এজন্য বাবুই পাখিকে অনেকে তাঁতি পাখি বলে। ঝুলন্ত বাসার প্রবেশের সৃড়ঙ্গপথ বেশ আঁকাবাঁকা। বাংলাদেশে আছে তিন প্রজাতির বাবুই পাখি। বাবুই প্রজনন ঋতু ছাড়া অন্য সময় পুরুষ ও স্ত্রী পাখির কালো কালো দাগসহ পিঠ হয় তামাটে বর্ণের, নিচের দিকে দাগ নেই, শুধুই তামাটে। ঠোঁট পুরু, মোচাকার, লেজ চৌকা, প্রজনন ঋতুতে পুরুষ পাখির পিঠ হয় গাঢ় বাদামি। হলুদ বুকের ওপরের দিক ফ্যাকাশে। দেশের সর্বত্র বিস্তৃত। প্রজনন ঋতুতে পুরুষ পাখির মাথার চাঁদি উজ্জ্বল সোনালি-হলুদ, গলা সাদা এবং তা একটি কালো ডোরা দ্বারা নিচের তামাটে-সাদা রঙের অংশ থেকে পৃথক। অন্য সময় স্ত্রী ও পুরুষ পাখির চাঁদি পিঠের পালকের মতোই বাদামি। বুকের কালো ডোরা ততটা স্পষ্ট নয় ও প্রকট ভ্রুণ রেখা, কানের পেছনে একটি ফোঁটা। এরা দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বিস্তৃত। বুক তামাটে, তাতে স্পষ্ট দাগ।
পরিবেশবিদদের মতে, বাবুই পাখি বিলুপ্ত হওয়ার পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ রয়েছে। গ্রামাঞ্চলে বড় বড় তালগাছ, নারিকেল গাছ ও খেজুর গাছ আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়া, জমিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে পাখিদের প্রধান খাদ্য শস্যকণা ও ছোট পতঙ্গ বিষাক্ত হয়ে পড়ছে। অসময়ে ঝড় ও অতিবৃষ্টির ফলে অনেক সময় বাসা তৈরির আগেই তা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এরা দলবেঁধে বসবাস করতে বেশি পছন্দ করে। বাবুই পাখি সাধারণত বিভিন্ন ধরনের ধান, বীজ, পোকা, ঘাস, ছোট উদ্ভিদের পাতা, ফুলের মধু-রেণু ইত্যাদি খেয়ে জীবনধারণ করে। গ্রীষ্মকাল এদের প্রজনন ঋতু। তারা সাধারণত কাটা জাতীয় তাল, খেজুর ও বাবলা গাছে বাসা তৈরি করে। বাসা তৈরি ও খাবার সংগ্রহে সুবিধা হয় এমন স্থান নির্বাচন করে। বাবুই পাখির বাসাটা খুবই শিল্প কারুকাজে সমৃদ্ধ বাসা। বাবুই পাখিকে শিল্পী পাখিও বলা হয়। বাসস্থান ও নিরাপত্তার অভাবে শিল্পী পাখিটা দিন দিন উজাড় হয়ে যাচ্ছে। তাল ও খেজুর গাছগুলো কেটে যেভাবে উজাড় করা হচ্ছে তাতে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই বাবুই পাখি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এ প্রজাতির পাখিকে সংরক্ষণের খুবই দরকার।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

