ফ্যাসিস্ট আওয়ামী শাসনামলে খুলনা ওয়াসায় প্রকল্পে নিয়োগপ্রাপ্ত কয়েকজন কর্মকর্তা প্রকল্প শেষে রাজস্ব খাতে স্থায়ী নিয়োগ পান। দলীয় সুপারিশে নিয়োগপ্রাপ্ত এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নানা দুর্নীতি অনিয়মের বিস্তর অভিযোগ ওঠে।
এখন এসব কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। রোববার ঢাকায় অনুষ্ঠিত বোর্ড সভায় উঠছে প্রস্তাব। সোমবার খুলনায় নিয়োগ ও পদোন্নতি সভায় তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে। এনিয়ে ওয়াসার ভেতরে-বাইরে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
খুলনা ওয়াসা সূত্রানুযায়ী, এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) আর্থিক সহযোগিতায় ২ হাজার ৫৫১ কোটি ব্যয়ে ২০১১-২০১৯ মেয়াদে খুলনা পানি সরবরাহ প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়। ২০১১ সালে উক্ত প্রকল্পে খান সেলিম আহম্মদকে প্রকল্প ব্যবস্থাপক/তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, কামাল হোসেন ও আরমান সিদ্দিকীকে নির্বাহী প্রকৌশলী, মোস্তাফিজুর রহমান, চিন্ময় কুমার বৈদ্য ও মাহবুবুর রহমান শামীমকে উপ-সহকারী প্রকৌশলীসহ আরও কিছু কর্মচারী নিয়োগ করা হয়। আওয়ামী আমলের রীতি অনুযায়ী নিয়োগের সময় এসব কর্মকর্তাদের সুপারিশপত্রে স্পষ্টভাবে আওয়ামী লীগ পরিবারের লোক হিসেবে উল্লেখ ছিল। ২০১৭ সালের ১৬ নভেম্বর ওয়াসার ৫২তম বোর্ড মিটিংয়ে ওইসব কর্মকর্তাসহ ১০ জনের চাকরি রাজস্ব খাতে স্থানান্তর ও স্থায়ী করার সুপারিশ করে। সে অনুযায়ী স্থানীয় সরকার বিভাগের পানি সরবরাহ-৩ অধিশাখা ২০১৮ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ৯ জনের স্থায়ী নিয়োগ অনুমোদন করে। ওয়াসার আওয়ামী সরকারের সময়ের মেগা প্রকল্পগুলো তাদের মাধ্যমেই পরিচালিত হতো। আওয়ামী সরকার পতনের পরও ওই সিন্ডিকেটই বহাল তবিয়তে রয়েছে এবং সোমবার (১৮ মে) বিশেষ পদোন্নতির মাধ্যমে তাদের পুরস্কৃত করার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হবে।
মেগা প্রজেক্ট ডাইরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করা খান সেলিম আহাম্মদকে প্রধান প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পানি সরবরাহ প্রকল্পের প্রজেক্ট ম্যানেজার হিসেবে ওয়াসার তৎকালীন এমডি অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ার আবদুল্লাহ পিইঞ্জের সাথে মিলে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতিতে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
মোহাম্মদ আরমান সিদ্দিকী মিটার চুরির তদন্তকারী কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি দীর্ঘ সময়েও তদন্ত রিপোর্ট জমা দেননি এবং প্রকৃত দোষীদের আড়াল করে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে পুরো ঘটনা ধামাচাপা দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে।
কামাল হোসেনকেও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে।
আশেকুর রহমান বর্তমানে জোনাল কর্মকর্তা। তার জোন থেকে প্রায় ৮০০ মিটার গায়েব হয়েছে। এই ৮০০ মিটারে ওয়াসার কয়েক কোটি টাকার পানির বিল ও রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাকে সহকারী প্রকৌশলী থেকে নির্বাহী প্রকৌশলী করা হচ্ছে।
ভাণ্ডার কর্মকর্তা বিপ্লব মজুমদার মিটার চুরির অন্যতম হোতা বলে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাকে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, শুধু যে ১৬০০ মিটার চুরি হয়েছে তা নয়, প্রতিটি মিটারে গড়ে প্রায় ১ লক্ষ টাকা থেকে ৫ লক্ষ টাকার অধিক পানির বিল বকেয়া ছিল। সেই বকেয়া বিলের রেকর্ড নষ্ট করতেই মিটারগুলো 'গায়েব' বা চুরি দেখানো হয়েছে। এতে সরকারের কয়েক কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। ফ্যাসিস্ট সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট এসব কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা না নিয়ে কেন তড়িঘড়ি করে পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে খুলনা ওয়াসার কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।
খুলনা ওয়াসার উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (অর্থ ও প্রশাসন) ঝুমুর বালা জানান, রোববার ঢাকায় বোর্ড মিটিংয়ে বিষয়টি উত্থাপিত হয়েছে। সোমবার ৬ সদস্যবিশিষ্ট কমিটির সামনে পদোন্নতির জন্য সুপারিশপ্রাপ্তদের ফাইল উপস্থাপন করা হবে।
সুপারিশপ্রাপ্তদের বিষয়ে অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রত্যেকের ফাইল এ কমিটি যাচাই বাছাই করবে। তারাই বিবেচনা করবেন পদোন্নতি পাবে কি-না।
এএস
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

