কুষ্টিয়ার অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সদর উপজেলার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানার অন্তর্গত ঝাউদিয়া শাহী মসজিদ। ঝাউদিয়া গ্রামে অবস্থিত মোগল স্থাপত্যশৈলীর এই অনিন্দ্যসুন্দর মসজিদটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ধর্মীয় আবেগের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শৈল্পিক নির্মাণশৈলী ও প্রাচীন হওয়ার কারণে এটি কেবল উপাসনালয়ই নয়, বরং কুষ্টিয়ার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবেও পরিচিত।
কুষ্টিয়া শহর থেকে প্রায় ২৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত তিন গম্বুজবিশিষ্ট এ মসজিদটির চার কোণে রয়েছে চারটি মিনার। ধারণা করা হয়, মোগল সম্রাট শাহজাহান অথবা আওরঙ্গজেবের শাসনামলে এটি নির্মাণ করা হয়। ইরাক থেকে আগত ধর্মপ্রচারক শাহ সুফি আহমদ আলি চৌধুরী ওরফে আদারী মিয়া চৌধুরী এটি নির্মাণ করেন বলে জনশ্রুতি আছে। প্রায় ৪০০ বছর আগে নির্মিত এই মসজিদ এক সময় এ অঞ্চলে ইসলাম প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল।
তবে মসজিদটির নির্মাণকাল নিয়ে বিভিন্ন লোককথা প্রচলিত রয়েছে। অনেকে দাবি করেন, অলৌকিকভাবে এক রাতেই এটি নির্মিত হয়েছিল। তবে স্থানীয় সচেতন মহল ও গবেষকদের মতে, এটি মূলত মোগল আমলের একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা।
মসজিদটির ভেতরের পশ্চিম দেয়ালে তিনটি মেহরাব রয়েছে, এগুলোর নকশা তিনরকম। মাটির টালি, চুন-সুরকি দিয়ে নির্মিত মসজিদের উত্তর ও দক্ষিণ দিকে দুটি দৃষ্টিনন্দন জানালা রয়েছে। মোগল আমলে নির্মিত অন্যান্য স্থাপনার সঙ্গে এ মসজিদের নির্মাণশৈলীতে অনেক সামঞ্জস্য লক্ষ করা যায়। মোগল আমলের বেশিরভাগ স্থাপনার মতো এ মসজিদেও লাল জাফরি ইট ব্যবহৃত হয়েছে। মসজিদের ভেতরে সূক্ষ্ম কারুকাজ পারস্যের মুরাকামি নকশা দ্বারা প্রভাবিত এবং সূক্ষ্ম এই নকশা দারুণ নান্দনিক সৌন্দর্যের সৃষ্টি করেছে। মসজিদের মেহরাব, দেয়াল ও গম্বুজের ভেতরের অংশে জ্যামিতিক নকশার সঙ্গে ফুল ও লতাপাতার চমৎকার নকশা আঁকা আছে। উত্তর-দক্ষিণে প্রায় ৪৬ দশমিক ফুট দীর্ঘ ও পূর্ব-পশ্চিমে ১৫ ফুট প্রশস্ত আয়তাকার মসজিদটিতে একসঙ্গে প্রায় ১০০ মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন।
১৯৬৮ সালে মসজিদটিকে প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত করা হয়। এরপর থেকে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এটি সংরক্ষণ করে আসছে। চুক্তিনামা অনুযায়ী এ মসজিদের মোতাওয়াল্লি (তত্ত্বাবধায়ক) হিসেবে থাকবেন আহমদ আলী চৌধুরী অথবা তারই বংশধর।
মসজিদ চত্বরের প্রবেশপথে রয়েছে বড় গেট ও দুই পাশে দুটি ছোট গম্বুজ। তবে অধিকসংখ্যক মুসল্লির জন্য স্টিলের কাঠামো ও ত্রিপল দিয়ে তৈরি অস্থায়ী ছাউনি মূল স্থাপনার সৌন্দর্য কিছুটা আড়াল করেছে বলে মনে করেন স্থানীয়রা।
প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজ ঘিরে এখানে হাজারো মুসল্লি ও দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ নামাজ আদায়, মানত ও ঐতিহাসিক স্থাপনাটি দেখতে আসেন। অনেকেই ছাগল, হাঁস-মুরগি ও রান্না করা খাবার নিয়ে উপস্থিত হন।
স্থানীয় ঝাউদিয়া কলেজের শিক্ষক মো. লাভলু আমার দেশকে বলেন, মানুষের মধ্যে ভুল ধারণা রয়েছে যে, এই মসজিদ এক রাতে তৈরি হয়েছে কিংবা এখানে মানত করলে মনের আশা পূরণ হয়। আসলে এটি ঐতিহাসিক একটি মসজিদ। মানত করতে চাইলে নিজের এলাকার মসজিদে দেওয়া উচিত, এতে স্থানীয় গরিব মানুষ উপকৃত হবে।
শাহ সুফি আহমদ আলী চৌধুরীর বংশধর ফরহাদ চৌধুরীও একই মত প্রকাশ করে বলেন, অনেকে এখানে মানতের নামে বনভোজন করতে আসেন। অথচ নিজ এলাকার গরিব মানুষদের সহযোগিতা করাই বেশি কল্যাণকর।
মসজিদ চত্বরে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের একটি সতর্কতামূলক বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ রয়েছে, সংরক্ষিত এই পুরাকীর্তির কোনো ধরনের ক্ষতি, বিকৃতি বা দেয়ালে লেখা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। ১৯৬৮ সালের পুরাকীর্তি সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী এজন্য জেল-জরিমানার বিধান রয়েছে।
ঢাকা থেকে যেভাবে যাবেন
ঢাকার কল্যাণপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে এসবি সুপার ডিলাক্স, শ্যামলী কিংবা হানিফ পরিবহনের বাসে কুষ্টিয়া যাওয়া যায়। এছাড়া সুন্দরবন, বেনাপোল ও মধুমতি এক্সপ্রেস ট্রেনেও যাওয়া সম্ভব। কুষ্টিয়া শহরের চৌড়হাঁস মোড় থেকে বাস বা সিএনজি অটোযোগে ঝাউদিয়া-মাছপাড়া সড়ক হয়ে পৌঁছানো যাবে ঝাউদিয়া শাহী মসজিদে।
এছাড়া কুষ্টিয়া শহরে থাকার জন্য উল্লেখযোগ্য আবাসিক হোটেলগুলোর মধ্যে রয়েছে দিশা টাওয়ার, হোটেল রাতুল ও হোটেল নূর। অন্যদিকে খাওয়ার জন্য কুষ্টিয়া শহরে রয়েছে খেয়া রেস্টুরেন্ট, পালকি, চিলিস ফুড পার্ক, কাচ্চি ভাই, জাহাঙ্গীর হোটেল ও শিল্পী হোটেলসহ বেশ কয়েকটি পরিচিত খাবারের রেস্তোরাঁ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


যুদ্ধে সুস্পষ্টভাবে জিতেছে ইরান: ইসরাইলের সাবেক নিরাপত্তাপ্রধান