ময়মনসিংহে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মহানগর শাখার সদস্য সচিব আল নূর মোহাম্মদ আয়াশের (২৫) ওপর হামলার প্ররোচনাকারী ফেসবুকে সমন্বয়কদের ‘ঝুলিয়ে হত্যা’র মাধ্যমে প্রতিবিপ্লবের ডাক দেয়া সেই বদরুল আমীন সম্পর্কে লিখিতভাবে বিস্তারিত জানানোর পরও গ্রেপ্তার করা হয়নি।
এ বর্বর হামলার এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট কুল খুঁজে পায়নি পুলিশ। ২৬ মে আয়াশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এ বিষয়ে মামলা হলেও এখন পর্যন্ত মূল পরিকল্পনাকারীদের শনাক্ত করা হয়নি। অথচ, ২৩ মে ২০২৫ তারিখে বদরুল আমীন তার ফেসবুক প্রোফাইলে আন্দোলনের সমন্বয়কারীদের ‘ঝুলিয়ে প্রতিবিপ্লব ঘটানো’র সরাসরি আহ্বান জানান। পরবর্তীতে জনমতের চাপে পোস্টটি মুছে ফেলেন বদরুল, তবে সেটির স্ক্রিনশট ও আর্কাইভ লিংক এখনও অনলাইনে রয়েছে।
ভুক্তভোগী আয়াশ জানান, ‘হাসপাতাল থেকে আজই আমি রিলিজ পেয়েছি। আমি লিখিত ও মৌখিক উভয়ভাবেই অভিযোগ দিয়েছি। কথিত সাংবাদিক বদরুল আমীনের বিরুদ্ধে আলাদা করে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। কিন্তু পুলিশ এখনও তাকে গ্রেপ্তার করেনি। শুধু লোকদেখানোর জন্য দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে, অথচ আমাকে হামলা করেছে ৫-৬ জন। এই হামলার পেছনে আওয়ামী লীগের প্রত্যক্ষ ইন্ধন রয়েছে। তাহলে পুলিশ এতদিন কী করলো? আমার যদি আবারও কোনো ক্ষতি হয়, তার দায় প্রশাসনকেই নিতে হবে। আমি শীঘ্রই আবার আন্দোলনে ফিরবো।’
আয়াশ অভিযোগ করে বলেন, হামলাকারীরা ‘বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল’ ভাঙচুরে তার ভূমিকার প্রতিশোধ নিতে হামলা চালিয়েছে। হামলার সময় আওয়ামী সন্ত্রাসীরা বলে, ‘তোদের সমন্বয়কদের একেকটাকে ধরে পিটিয়ে শেষ করে দেবো। তোদের অস্তিত্ব রাখব না।’
আয়াশ আরো বলেন, ফেসবুক পোস্টের সূত্র ধরে এটুকু বলতে পারি, এই হামলার নেপথ্যে আওয়ামী দোসর কথিত সাংবাদিক বদরুল আমীন জড়িত, যিনি বিগত ১৬ বছর ধরে পুলিশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে সাধারণ মানুষকে পুলিশি হয়রানি করে আসছেন। তার একটি অডিও ক্লিপ সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে, যেখানে পুলিশের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কের প্রমাণ মিলেছে।
এদিকে পুলিশের নির্লিপ্ত ভূমিকার কারণে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। বদরুল আমীন শুধু ফেসবুকে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে উসকানিমূলক পোস্ট দিচ্ছেন না, একইসাথে যেসব সাংবাদিক বিষয়টি তুলে ধরছেন, তাদের বিরুদ্ধেও হুমকি ও কুরুচিপূর্ণ অপপ্রচার চালাচ্ছে।
আমার দেশ পত্রিকায় সমন্বয়কদের নিরাপত্তা ও হুমকিদাতার পোস্ট নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর বদরুল আমীন পত্রিকাটির ময়মনসিংহ প্রতিনিধি মো. আব্দুল কাইয়ুমকে ‘জঙ্গি’ বলে অবহিত করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একের পর এক কুরুচিপূর্ণ ও আক্রমণাত্মক পোস্ট করে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে সাংবাদিক কাইয়ুম বলেন, ‘সত্যনিষ্ঠ ও তথ্যনির্ভর সংবাদ প্রকাশ করায় বদরুল আমীন আমার বিরুদ্ধে উল্টো অপপ্রচারে নেমেছে। সে আমাকে ‘জঙ্গি’ বলছে, এমনকি আমার বাসার ঠিকানা চেয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছে যাতে আমি নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছি। এদিকে আওয়ামী লীগ আবারো ফিরে আসবে উল্লেখ করে ফেসবুকে একের পর এক পোস্ট করে যাচ্ছে এবং আমাকে নিয়ে নোংরা, কুরুচিপূর্ণ পোস্ট দিচ্ছে। আমি এই বিষয়ে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে অবগত করলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি তারা। আমি আমার নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত।’
অপরদিকে পুলিশের কতিপয় সদস্যের সঙ্গে বদরুল আমীনের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। ফলে বদরুলের বিরুদ্ধে নেয়া হচ্ছে না কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে ক্ষোভ বাড়ছে।
জানা যায়, বদরুল আমীন বর্তমানে স্থানীয় উর্মি বাংলা পত্রিকায় কাজ করেন, যার প্রকাশক ও সম্পাদক ময়মনসিংহ মহানগর আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সুমন ভৌমিক। অভিযোগ রয়েছে, পলাতক আওয়ামী নেতারা ময়মনসিংহের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে বদরুলসহ কিছু সাংবাদিককে অর্থায়ন করছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই ঘটনায় দায়ীদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় না আনা হলে পরিস্থিতি আরও অস্থির হয়ে উঠতে পারে। আয়াশের ওপর হামলা শুধু একজন ছাত্রনেতার ওপর আক্রমণ নয়, বরং তা সামগ্রিকভাবে গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলন দমনের একটি চিহ্নিত অপপ্রয়াস- যা দিন দিন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
এ বিষয়ে জানতে ময়মনসিংহ কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (চলতি) সাইফুল ইসলাম জানান, দু’জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে কথিত সাংবাদিক বদরুলের ব্যাপারে কোনো অভিযোগ পাইনি।
এ ব্যাপারে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জেলা সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক মাজহারুল ইসলাম জানান, আমরা স্পষ্ট করে পুলিশকে বলেছি ও লিখিত দিয়েছি যে, আওয়ামী দোসর বদরুল আমীন এই ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত। তারপরও পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
তবে জানা যায়, এই বদরুল আমীন পুলিশের সোর্স হিসেবে দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে কাজ করে আসছে। আওয়ামী সরকারের আমলের পুলিশ কর্মকর্তা যারা ময়মনসিংহে ছিল, তারা এখনও ময়মনসিংহে চাকুরিরত থাকায় বদরুলকে শেল্টার দিয়ে যাচ্ছে। কারণ, বদরুল হল কতিপয় পুলিশ কর্মকর্তার অবৈধ আয়ের উৎস।
এমএস
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

