রাজশাহী জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি গঠিত হয়েছিল তিন মাসের জন্য । সেই কমিটিই পার করেছে প্রায় আট বছর। দীর্ঘ এই সময়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটি কিংবা নতুন আহ্বায়ক কমিটি গঠন না হওয়ায় দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে। একই সঙ্গে সাংগঠনিক স্থবিরতার প্রভাব আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও পড়তে পারে বলে মনে করছেন দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।
দলীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একই আহ্বায়ক কমিটি দিয়ে জেলা বিএনপি পরিচালিত হওয়ায় নতুন নেতৃত্ব তৈরি, সাংগঠনিক মূল্যায়ন এবং তৃণমূলের কর্মীদের পদায়নের প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে মাঠপর্যায়ে সক্রিয় নেতাকর্মীদের একটি অংশের মধ্যে তৈরি হয়েছে হতাশা।
২০১৯ সালের ৬ জুলাই রাজশাহী জেলা বিএনপির ৪১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করে কেন্দ্র। এতে কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্য ও চারঘাট উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবু সাঈদ চাঁদকে আহ্বায়ক এবং বিশ্বনাথ সরকারকে সদস্যসচিব করা হয়। কমিটি ঘোষণার সময় তিন মাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু প্রায় আট বছরেও সেই কমিটি আর হয়নি।
দলীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী জেলা বিএনপির অধীনে ২৩টি সাংগঠনিক ইউনিট রয়েছে। এর মধ্যে ১৭টি ইউনিটের সম্মেলন হলেও এখন পর্যন্ত সবটির পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়নি। অন্যদিকে কয়েকটি ইউনিটে দীর্ঘদিন ধরে সম্মেলনই হয়নি। ফলে ইউনিয়ন, উপজেলা ও পৌর পর্যায়ে সাংগঠনিক কার্যক্রমেও স্থবিরতা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ তৃণমূলের।
দলীয় একাধিক সূত্রের দাবি, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবু সাঈদ চাঁদ ও সদস্যসচিব বিশ্বনাথ সরকারের মধ্যে সাংগঠনিক বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। অতীতে দুজনের মধ্যে যোগাযোগও অনেকটা সীমিত হয়ে পড়েছিল বলে দাবি করেন দলের নেতারা। তবে এ বিরোধের কথা অস্বীকার করেছেন বিশ্বনাথ সরকার।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, বিশ্বনাথ সরকার রাজশাহী-১ আসন এবং আবু সাঈদ চাঁদ রাজশাহী-৬ আসন থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। গোদাগাড়ী-তানোর এলাকার ইউনিয়ন কমিটি গঠনসহ বিভিন্ন সাংগঠনিক বিষয়কে কেন্দ্র করে দুজনের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হয় বলে দাবি করা হচ্ছে। রাজশাহী-৫ আসনের ইউনিয়ন কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করেও তাদের বিরোধ প্রকাশ্যে আসে বলে দলীয় নেতাদের ভাষ্য।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে জেলা বিএনপির সদস্যসচিব বিশ্বনাথ সরকার বলেন, ‘আমাদের মধ্যে তেমন কোনো বিরোধ নেই। কর্মীরা কী ভেবে এসব কথা বলেছেন, তা আমার জানা নেই।’
তৃণমূলের নেতাকর্মীদের বড় একটি অংশ মনে করছেন, দীর্ঘদিন কমিটি না থাকায় দলের সাংগঠনিক সক্ষমতা কমছে। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে থাকায় দ্রুত জেলা ও অঙ্গসংগঠনগুলোর কমিটি পুনর্গঠন না হলে এর প্রভাব নির্বাচনি মাঠে পড়তে পারে।
নওহাটা পৌর যুবদলের নেতা মিজানুর রহমান বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে জেলা বিএনপি ও যুবদলের কমিটি দ্রুত গঠন করা প্রয়োজন। দীর্ঘদিন কমিটি না থাকায় তৃণমূলে চাপা ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে। স্থানীয় নির্বাচনে দলের প্রার্থী ও কর্মীদের সমন্বয়, প্রচার এবং ভোটকেন্দ্র ভিত্তিক সাংগঠনিক কার্যক্রমে যুবদলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। তাই শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো ছাড়া নির্বাচনে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হতে পারে।
স্থানীয় বিএনপি কর্মী রাসেদুল ইসলাম বলেন, দলের দুঃসময়ে যারা মাঠে ছিলেন, মামলা-হামলা ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও সংগঠনের সঙ্গে ছিলেন, নতুন কমিটিতে তাদের মূল্যায়ন করা দরকার। রাজশাহীর মতো গুরুত্বপূর্ণ জেলায় ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের দায়িত্ব না দিলে তৃণমূলের কর্মীরা হতাশ হবেন।
জেলা বিএনপির এক তৃণমূল নেতা ফিরোজ হোসেন বলেন, কমিটি দীর্ঘদিন না থাকায় অনেক যোগ্য ও তরুণ নেতা নিজেদের সাংগঠনিক পরিচয় ও দায়িত্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। স্থানীয় নির্বাচন হলে তখন হঠাৎ করে সবাইকে মাঠে নামানো কঠিন হবে। এখন থেকেই নেতৃত্বের কাঠামো ঠিক করা প্রয়োজন।
আপর একজন তৃণমূল নেতা আব্দুস সালাম বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুধু প্রার্থী দেওয়ার বিষয় নয়, এটি সংগঠনের শক্তি যাচাইয়েরও পরীক্ষা। ওয়ার্ড, ইউনিয়ন ও পৌরসভা পর্যায়ে সক্রিয় নেতৃত্ব না থাকলে ভোটের মাঠে তার প্রভাব পড়বে। তাই দ্রুত কমিটি হলে দল ও তৃণমূল উভয়ই লাভবান হবে।
শুধু জেলা বিএনপি নয়, অঙ্গসংগঠনগুলোর মধ্যেও দীর্ঘদিন ধরে সাংগঠনিক জটিলতা রয়েছে। ২০২১ সালের নভেম্বরে কেন্দ্রীয় যুবদলের দপ্তর সম্পাদক কামরুজ্জামান দুলাল স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে মাসুদুর রহমান সজনকে আহ্বায়ক এবং রেজাউল করিম টুটুলকে সদস্যসচিব করে রাজশাহী জেলা যুবদলের দুই সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। দলীয় নেতাদের ভাষ্য, রাজশাহী জেলা যুবদলের ২১টি সাংগঠনিক ইউনিটের মধ্যে মাত্র তিনটির কমিটি ঘোষণা হয়েছে। বাকি ইউনিটগুলোর অনেকই কয়েক বছর ধরে নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রয়েছে।
বর্তমান কমিটির আহ্বায়ক ও রাজশাহী-৬ (বাঘা-চারঘাট) আসনের এমপি আবু সাঈদ চাঁদ বলেন, আমাদের নেতৃত্বাধীন কমিটি আন্দোলন-সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ২৩টি ইউনিটের প্রায় সবগুলোতেই কাউন্সিলের মাধ্যমে কমিটি করা হয়েছে। বাকি কমিটিগুলোও দ্রুত করে ফেলব।
বিএনপির রাজশাহী বিভাগীয় কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট সৈয়দ শাহীন শওকত বলেন, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার শাসনামলে মামলা, হামলা, হয়রানি এবং গণহারে গ্রেপ্তারের কারণে দেশের কোনো জেলাতেই বিএনপি স্বাভাবিকভাবে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেনি। ৫ আগস্টের পরও বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক বিষয় নিয়ে কাজ করতে হয়েছে। এর মধ্যে অনেক সাংগঠনিক কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। দলের কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে এসব কমিটির বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শুধু কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় না থেকে স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠনের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। দীর্ঘদিন ধরে কমিটি না থাকা, অঙ্গসংগঠনের নিষ্ক্রিয়তা এবং নেতৃত্ব নিয়ে অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন কাটাতে না পারলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপিকে সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে।
জেলার সুপরিচিত রাজনৈতিক বিশ্লেষক আনোয়ার হোসেন বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন জাতীয় নির্বাচনের চেয়ে অনেক বেশি ব্যক্তি ও সংগঠননির্ভর। ইউনিয়ন, পৌরসভা ও ওয়ার্ড পর্যায়ে সক্রিয় কমিটি না থাকলে ভোটের দিন কর্মীদের সমন্বয় করা কঠিন হয়। রাজশাহী জেলা বিএনপিতে যদি দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক জট দ্রুত নিরসন করা না যায়, তাহলে নির্বাচনি মাঠে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তৃণমূলের নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে দ্রুত রাজশাহী জেলা বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোর নতুন কমিটি ঘোষণা করা হবে। তাদের মতে, প্রবীণদের অভিজ্ঞতা এবং তরুণদের উদ্যমের সমন্বয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ নেতৃত্ব তৈরি করা গেলে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজশাহী বিএনপি সাংগঠনিকভাবে আরো শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

