রাজশাহীতে ধান-চালে দরপতন, বিপাকে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা

মঈন উদ্দিন, রাজশাহী

রাজশাহীতে ধান-চালে দরপতন, বিপাকে কৃষক 
ও ব্যবসায়ীরা

রাজশাহী অঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় ধান ও চালের বাজারে হঠাৎ দরপতনে চরম বিপাকে পড়েছেন কৃষক এবং ব্যবসায়ীরা। বাজারে ধানের দাম কমে যাওয়ায় কৃষকরা উৎপাদন খরচ তুলতে হিমশিম খাচ্ছেন। একই সঙ্গে চালের দাম কমে যাওয়ায় লোকসানের মুখে পড়েছেন মিল মালিক ও ব্যবসায়ীরা। এতে কৃষি এবং খাদ্য খাতে তৈরি হয়েছে এক ধরনের অস্থিরতা, যা দীর্ঘ মেয়াদে বড় সংকটে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।

জানা গেছে, গত এক মাসে প্রতিমণ ধানের দাম ২০০-৪০০ টাকা পর্যন্ত কমেছে। অন্যদিকে চালের বাজারে প্রতি কেজিতে ২-৬ টাকা পর্যন্ত দর কমেছে। বাজারে এই দ্রুত দরপতন কৃষক ও ব্যবসায়ী উভয়কেই চাপের মুখে ফেলেছে।

বিজ্ঞাপন

রাজশাহীর পবা উপজেলার নওহাটা হাটসহ মোহনপুর ও বাগমারা এবং নওগাঁর দেলোয়াবাড়ি হাটে গিয়ে দেখা যায়, ব্রি-২৮ ধান প্রতিমণ বিক্রি হচ্ছে ১৩০০-১৫০০ টাকায়, যা এক মাস আগে ছিল প্রায় ১৬৫০ টাকা। জিরাশাইল ধান ১৯০০ টাকা থেকে নেমে এসেছে ১৬০০ টাকায়। ব্রি-৭৫ ধান ১৩৫০ টাকা থেকে কমে এখন বিক্রি হচ্ছে ১১৫০ টাকায়। একইভাবে স্বর্ণা-৫ ধান ১২০০ টাকা থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ১০০০ টাকায়।

বাগমারার দামনাশ হাটের আড়তদার শহিদুল ইসলামসহ কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় জেলার বাইরের ব্যবসায়ীরা আগের মতো আসছেন না। এছাড়া নতুন ধান বাজারে আসার সম্ভাবনায় সরবরাহ বেড়ে গেছে, যা দামের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।

দেলোয়াবাড়ি হাটে ধান নিয়ে আসা কৃষক আসাদুল ইসলাম বলেন, ধানের দর বাড়বে ভেবে ধান ধরে রেখেছিলাম। একমণ ধান উৎপাদনে খরচ হয়েছে ১৪৫০-১৫০০ টাকা, অথচ বিক্রি করতে হচ্ছে ১২০০-১৩০০ টাকায়। এতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছি। তার মতো অনেক কৃষকই এখন ঋণ পরিশোধ ও নতুন মৌসুমের প্রস্তুতি নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।

পবা উপজেলার কেশরহাটের ধান ব্যবসায়ী নওশাদ আলী বলেন, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাবে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে, যার ফলে পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। এতে অন্য জেলার ক্রেতা কমে বাজারে ক্রেতা সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে বাজারে প্রতিযোগিতা কমে দামের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

অন্যদিকে চাল ব্যবসায়ীরাও একই ধরনের সংকটে রয়েছেন। বাজারে চালের দাম কমে যাওয়ায় তারা ধান বেশি দামে কিনতে পারছেন না। রাজশাহীর বিভিন্ন চালকল মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিদেশ থেকে চাল আমদানি বেশি থাকায় দেশি চালের চাহিদা কমেছে।

দামকুড়া এলাকার চাল ব্যবসায়ী জানে আলম জানান, চালের দাম কম থাকায় ধানও কম দামে কিনতে হচ্ছে। এতে প্রতি লটে লোকসান গুনতে হচ্ছে এবং অনেকেই উৎপাদন কমানোর কথা ভাবছেন।

রাজশাহী মহানগরীর সাহেববাজার, বিসিক, পুঠিয়ার বানেশ্বর ও চারঘাটের চালের মোকামগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পাইকারি পর্যায়ে এক মাসের ব্যবধানে বিভিন্ন ধরনের চালের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বর্তমানে স্বর্ণা-৫ চাল প্রতিকেজি ৪২-৪৩ টাকা, জিরাশাইল ৬৭-৬৮ টাকা, কাটারীভোগ ৭৪-৭৬ টাকা এবং আঠাশ ৫৮-৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ একমাস আগেও এসব চালের দাম বেশি ছিল।

কৃষি বিশ্লেষকরা বলছেন, বাজারে এই দরপতনের পেছনে সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্যহীনতা বড় কারণ। কৃষি অর্থনীতিবিদ আব্দুস সালাম জানান, নতুন মৌসুমের ধান বাজারে আসার আগাম প্রত্যাশা, পর্যাপ্ত মজুত এবং আমদানির চাপ মিলিয়ে বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ তৈরি হয়েছে। এতে দাম দ্রুত কমে গেছে।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, উৎপাদন খরচ বাড়লেও বিক্রয়মূল্য কমে যাওয়ায় কৃষকদের নিরুৎসাহিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। স্থানীয় অর্থনীতিবিদরা বলেন, যদি এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে কৃষকরা ধান চাষে আগ্রহ হারাতে পারেন। এতে ভবিষ্যতে খাদ্য উৎপাদনে প্রভাব পড়তে পারে, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ।

রাজশাহী জেলা চালকল মালিক সমিতির সভাপতি রফিকুল ইসলাম বলেন, ধান ও চালের বাজারে স্থিতিশীলতা আনতে সরকারকে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নির্ধারণ এবং বাজার তদারকি জোরদার করা না হলে কৃষক ও ব্যবসায়ী উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে কৃষক ও চালকল শিল্পÑ উভয়ই বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকারি হস্তক্ষেপ, আমদানি নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষকদের জন্য প্রণোদনা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন