আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

দিগন্তজুড়ে সরিষার রাজ্য

সিরাজগঞ্জে সরিষা ও মধুর ১২০০ কোটি টাকার বাজার

বেলাল হোসেন, সিরাজগঞ্জ থেকে ফিরে

সিরাজগঞ্জে সরিষা ও মধুর ১২০০ কোটি টাকার বাজার

সিরাজগঞ্জ জেলার মাঠজুড়ে এখন হলুদ সরিষা ফুলের সমারোহ। অন্য বছরের মতো এবারো জেলায় ব্যাপক সরিষা চাষ হয়েছে। পাশাপাশি এর ফুল থেকে মধু সংগ্রহেও ব্যাপক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সরেজমিনে দেখা যায়, জেলার বিভিন্ন এলাকায় সরিষা ক্ষেতের পাশে মৌ-বাক্স স্থাপন করে মধু সংগ্রহ করছেন মৌ খামারিরা। এতে সরিষা ও মধু মিলিয়ে চলতি মৌসুমে প্রায় এক হাজার ২০০ কোটি টাকার বাণিজ্যের আশা করছে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) জানায়, বর্ষা মৌসুমে জমিতে পলি জমায় এ অঞ্চলের মাটিতে সরিষা চাষ ভালো হয়। চলতি মৌসুমে চলনবিল অধ্যুষিত উল্লাপাড়া, তাড়াশ, রায়গঞ্জ ও শাহজাদপুর উপজেলায় প্রাথমিকভাবে ৯০ হাজার হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে আবাদ হয়েছে ৯০ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে, যা গত বছরের ৮৭ হাজার হেক্টরের তুলনায় অনেক বেশি। কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে এ বছর জেলায় প্রায় এক লাখ ৪৬ হাজার মেট্রিক টন সরিষা উৎপাদন হতে পারে বলে জানায় অধিদপ্তর।

বিজ্ঞাপন

উন্নত জাতের বীজ ব্যবহার ও অনুকূল আবহাওয়ার ফলে কৃষকরা বিঘাপ্রতি পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা খরচ করে সাত থেকে আট মণ পর্যন্ত সরিষা উৎপাদনের আশা করছেন। বাজারে দাম ভালো থাকলে এ মৌসুমে কৃষকদের ভালো লাভ হবে বলে প্রত্যাশা তাদের।

সরিষার পাশাপাশি অর্থকরী ফসল হিসেবে মধু উৎপাদনও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। চলতি মৌসুমে জেলায় চার লাখ চার হাজার কেজি মধু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে কৃষি বিভাগ। এ বছর দেড় লাখ টন সরিষা ও প্রায় ৪০০ টন মধু উৎপাদনের লক্ষ্য ধরা হয়েছে, যার বাজারমূল্য আনুমানিক এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ২৫০ কোটি টাকা।

সদর উপজেলার যমুনার চর পূর্ব মোহনপুর গ্রামে উন্নত জাত বারি সরিষা-২০ চাষ করা হয়েছে। পার্টনার প্রকল্পের আওতায় ৩৫ জন কৃষকের প্রায় ১০০ বিঘা জমিতে নতুন এই জাতের সরিষা চাষ করা হচ্ছে। স্বল্প মেয়াদি এই জাতটি ৭৫–৮০ দিনের মধ্যেই কাটা যায়। প্রতি বিঘায় ছয় থেকে সাত মণ ফলন পাওয়া যায় এবং তেলের পরিমাণও তুলনামূলক বেশি। সরিষা কাটার পরপরই কৃষকরা বোরো ধান চাষ করতে পারছেন।

এই প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়া কৃষক আব্দুল আউয়াল বলেন, আমার তিন বিঘা জমিতে আগে কোনো ফসল হতো না। এবার কৃষি অফিসের সহযোগিতায় বারি সরিষা-২০ চাষ করেছি। সরিষা উঠিয়ে আবার বোরো ধান লাগাব।

সিরাজগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক এ কে মনজুরে মওলা বলেন, সরিষা সিরাজগঞ্জ জেলার একটি পরিচিত ফসল। আমরা চাই এই ফসলের আবাদ আরো বাড়ুক। সে লক্ষ্যেই বারি উদ্ভাবিত নতুন জাত বারি সরিষা-২০ মাঠ পর্যায়ে সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।

তিনি জানান, বর্তমানে বারি সরিষা-১৪, ১৫ ও ১৭ বেশি জনপ্রিয়, যেগুলোতে বিঘাপ্রতি গড়ে চার থেকে পাঁচ মণ ফলন পাওয়া যায়। বারি সরিষা-২০ এর ফলন আরো বেশি, সাত-আট মণ পর্যন্ত হতে পারে। এটি খরা ও লবণাক্ততা সহনশীল হওয়ায় ভবিষ্যতে এ জাত সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

মধু উৎপাদন প্রসঙ্গে মনজুরে মওলা বলেন, সরিষার সঙ্গে মধু একটি গুরুত্বপূর্ণ চান্স ক্রপ। গত বছর এ এলাকায় ২৫৮ জন মৌ চাষি মৌ-বাক্স স্থাপন করেছিলেন। চলতি মৌসুমে এখন পর্যন্ত ২২০ জন এসেছেন। এরই মধ্যে প্রায় এক লাখ কেজি মধু সংগ্রহ করা হয়েছে।

জানা যায়, জেলার উল্লাপাড়া উপজেলা সরিষা ও মধু উৎপাদনে শীর্ষে রয়েছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুবর্ণা ইয়াসমিন জানান, উল্লাপাড়া শুধু সরিষা নয়, মধু উৎপাদনেও দেশের একক উপজেলা হিসেবে এগিয়ে। এই খাত শত শত বেকার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে।

তিনি আরো বলেন, চলনবিলের মধুকে জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি। গত বছর উল্লাপাড়ায় ১৮৩ মেট্রিক টন মধু উৎপাদন হয়েছিল। এ বছর তা বেড়ে প্রায় ১৯৫ মেট্রিক টনে পৌঁছাবে বলে আশা করছি।

উল্লেখ্য, দেশে বছরে প্রায় ২৪ লাখ মেট্রিক টন ভোজ্যতেলের চাহিদা থাকলেও দেশীয় উৎপাদনে মাত্র দুই থেকে আড়াই লাখ টন তেল পাওয়া যায়। বাকি অন্তত ২০ লাখ টন তেল আমদানি করতে হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভোজ্যতেল আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে হলে সরিষার আবাদ বাড়ানোর বিকল্প নেই। তবে আলাদা জমি না থাকায় উচ্চফলনশীল ও স্বল্পমেয়াদি জাত সম্প্রসারণের দিকেই গুরুত্ব দিচ্ছে কৃষি বিভাগ।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...