রাজশাহীর বিস্তৃত বরেন্দ্র অঞ্চলজুড়ে এখন বইছে সোনালি ধানের সুবাস। তীব্র তাপপ্রবাহ আর তপ্ত রোদ উপেক্ষা করে জেলার কৃষকরা মেতে উঠেছেন চলতি মৌসুমের বোরো ধান কাটা ও মাড়াইয়ের উৎসবে। ভোরের আলো ফুটতেই কাস্তে আর পান্তা ভাত নিয়ে মাঠে ছুটছেন কৃষকরা। কোথাও সনাতন পদ্ধতিতে কাস্তে দিয়ে ধান কাটা হচ্ছে আবার কোথাও কম্বাইন হারভেস্টার মেশিনের সাহায্যে ধান কাটা ও মাড়াই চলছে। মাড়াইয়ের পর ধান রোদে শুকানো এবং গোলাজাত করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন বাড়ির কিষানিরাও। গত এক সপ্তাহ আগে জেলায় ধান কাটার আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। বর্তমানে পুরোদমে চলছে ফসল ঘরে তোলার কাজ। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, মে মাসজুড়ে চলবে বিশাল এ কর্মযজ্ঞ।
রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলার ৯টি উপজেলা এবং মেট্রোপলিটন এলাকার বোয়ালিয়া ও মতিহার থানা এলাকায় মোট ৬৮ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। আবহাওয়া এখন পর্যন্ত অনুকূলে থাকায় ফসলের অবস্থা বেশ সন্তোষজনক। কৃষি বিভাগ এবার জেলায় মোট তিন লাখ ২৭ হাজার ৫৪৪ টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, হেক্টরপ্রতি গড় ফলন পাওয়া যাচ্ছে ৪ দশমিক ৭০ টন। মাঠ পর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত জেলার মোট আবাদের প্রায় ১০ শতাংশ ধান কাটা ও মাড়াই সম্পন্ন হয়েছে।
রাজশাহীর মাঠে এবার ধানের জাতের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে ব্যাপক বৈচিত্র্য। কৃষকরা তাদের পছন্দ এবং জমির ধরন অনুযায়ী মোট ৩৫টি ভিন্ন জাতের ধান চাষ করেছেন। এর মধ্যে উচ্চফলনশীল ব্রি-ধান এবং বিভিন্ন আধুনিক হাইব্রিড জাতের প্রাধান্য বেশি। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, বিভিন্ন জাতের ধান চাষ করার ফলে রোগবালাইয়ের ঝুঁকি যেমন কমেছে, তেমনি পর্যায়ক্রমে ধান পাকায় শ্রমিক ব্যবস্থাপনাও সহজ হচ্ছে।
কিন্তু এ আশার মাঝেই যেন কালো মেঘ হয়ে ভাসছে অন্য এক বাস্তবতা। রাজশাহী অঞ্চলজুড়ে চিকন ধান (জিরাশাইল) উৎপাদনে দেশজুড়ে ব্যাপক সুনাম থাকলেও এবার রাজশাহীতে সেই চিকন ধান নিয়েই কপালে ভাঁজ পড়েছে কৃষকদের। শ্রমিক সংকট ও বাজারে ধানের ন্যায্যমূল্য না থাকা একসঙ্গে যেন তাদের পিছু নিয়েছে। চাষিরা বলছেন, এক মণ ধান বিক্রি করে একজন শ্রমিকের মজুরি পর্যন্ত উঠছে না। বহিরাগত শ্রমিক না আসা এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার আতঙ্কে শ্রমিকের চাহিদা বেড়েছে। ফলে মজুরিও বৃদ্ধি পেয়েছে। আগে যেখানে মাড়াই বাবদ ১৫ কেজি ধান দিতে হতো, এখন ২০ কেজি পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। হালচাষ, সার, বীজ, কীটনাশকসহ সব খরচ বেড়েছে।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, বাজারে এক মণ চিকন ধান বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ১০০ থেকে এক হাজার ১৫০ টাকা দরে (৪১ কেজি)। অথচ চালের বাজারে দাম কমেনি। চাষিদের অভিযোগ, মিলার ও আড়তদাররা যোগসাজশ করে ধানের দাম নিয়ে সিন্ডিকেট করছে। তারা ভরা মৌসুমে কম দামে ধান সংগ্রহ করে মজুত করে এবং যখন কৃষকদের ঘরে ধান থাকে না তখন মজুত করা ধানের চাল উচ্চমূল্যে বাজারে সরবরাহ করে। অপরদিকে আড়তদাররা বলছেন, জ্বালানি সংকটের কারণে মিলারদের মোকাম থেকে নিয়মিত গাড়ি না আসায় ধানের দাম কমছে। তবে হাট বা ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে ধান বিক্রি করে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষকরা। তাদের মতে, হাট-বাজার থেকে সরাসরি সরকারিভাবে ধান সংগ্রহের ব্যবস্থা করলে কিছুটা হলেও ক্ষতি কমানো সম্ভব হতে পারে।
তানোরের চাষি রাজিব জানান, তিনি সাড়ে ১৪ বিঘা জমিতে বোরো ধান চাষ করেছিলেন। কিছু জমির ধান কেটে বাড়ি আনা হলেও শ্রমিক সংকটে বাকি ধান মাঠ থেকে ঘরে আনতে চিন্তায় আছেন। তিনি বলেন, ঋণ করে চাষাবাদ করেছি। ধান ঘরে রাখতে পারব না, বিক্রি করতে হবে। তবে বাজারে যে দাম, তাতে ঋণের টাকা উঠবে বলে মনে হয় না।
মনোরঞ্জন দাস মুনা নামে এক কৃষক ১৭ বিঘা জমি লিজ নিয়ে ধান চাষ করেছিলেন। লিজের টাকা ও সার-বীজ মিলিয়ে বিঘাপ্রতি প্রায় ২৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রতি বিঘায় চার-পাঁচ হাজার টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে তাকে। বর্তমান পরিস্থিতি চলতে থাকলে অনেক কৃষকই কৃষি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হবেন। ধানের দাম কম কিন্তু চালের দাম বেশি। এ পরিস্থিতিতে প্রান্তিক কৃষকরা চরম সংকটে পড়েছেন। তারা সরকারি হাটে সরাসরি ধান ক্রয় বা নির্ধারিত দামে সংগ্রহের দাবি জানিয়েছেন।
সরকারি খাদ্যগুদামে সরকার ধান ক্রয় করলেও প্রশাসনিক জটিলতা, লেবার ও পরিবহন খরচ ও দালালদের দৌরাত্ম্যের কারণে অনেক কৃষকই ধান নিয়ে সরকারি খাদ্যগুদামে যায় না। ফলে কৃষকরা কোনো সুবিধা বা উপকার পান না। চাষিরা আরো জানান, চলতি মৌসুমে আলু চাষে ব্যাপক লোকসানের পর ধানেও ক্ষতির মুখে পড়ায় অনেক কৃষক চরম সংকটে পড়েছেন।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) মিতা সরকার বলেন, সপ্তাহ আগে রাজশাহীতে ধান কাটা শুরু হয়েছে। বোরো ধান কোনো সমস্যা ছাড়াই ঘরে তুলতে পেরে খুশি কৃষকরা। ফলন ভালো হয়েছে। সামনের যে ধান কাটা বাকি আছে, সেগুলোয় আরো ভালো ফলন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ভালো ফলন পেতে কৃষকদের বিভিন্ন পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পুরো মাস বোরো ধান কাটার কার্যক্রম চলবে। বিশাল এ কর্মযজ্ঞ সফল হলে রাজশাহীর খাদ্য নিরাপত্তা আরো সুসংহত হবে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

