বগুড়া শহরে দিন দিন তীব্র হচ্ছে যানজট

সবুর শাহ লোটাস, বগুড়া

বগুড়া শহরে দিন দিন তীব্র হচ্ছে যানজট

উত্তরাঞ্চলের অন্যতম ব্যস্ত শহর বগুড়ায় দিন দিন বাড়ছে যানজট। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শহরের প্রধান প্রধান সড়কে লেগেই থাকে দীর্ঘ যানজট। এতে প্রতিদিনই চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ যাত্রীরা। সামান্য দূরত্ব অতিক্রম করতেও অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে নগরবাসীকে।

জানা গেছে, বগুড়ার উন্নয়নের রূপকার তারেক রহমানের নির্দেশে সর্বশেষ ২০০৩ সালে সড়ক সম্প্রসারণের কাজ হয়েছিল। এরপর ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের আমলে সড়ক দখল, যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং শুরু হয়। অবৈধ বাসস্ট্যান্ড, ফুটপাত দখল করে দোকান বসানো, সিএনজি ও অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত স্ট্যান্ড এবং শহরের ভেতরে বড় বড় কুরিয়ার ট্রাকের অবাধ চলাচলে যানজট তীব্র হয়। শহরের সাতমাথা, জিরো পয়েন্ট, চারমাথা, খান্দার, চেলোপাড়া, বনানী, মালতিনগর, শেরপুর রোড, কলোনি এলাকায় প্রতিদিনই তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। অফিস ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা থাকলে পরিস্থিতি আরো ভয়ঙ্কর রূপ নেয়।

বিজ্ঞাপন

অবৈধ বাসস্ট্যান্ডে সড়কে চাপ

শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়ে নির্দিষ্ট বাসস্ট্যান্ড না থাকায় অনেক পরিবহনের বাস প্রতিনিয়ত যত্রতত্র দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানামা করাচ্ছে। এতে সড়কের একটি বড় অংশ কার্যত বাসের দখলে চলে যায়। প্রতিদিন শহরের ভেতর দিয়ে বগুড়া-শেরপুর রুটের ‘করতোয়া গেট লক সার্ভিস’র ৫০টি গাড়ি যাতায়াত করে। স্কুল বাসগুলো বকশিবাজার, খান্দার, কালিতলা শিববাটি ও সেউজগাড়ীসহ ৫০ পয়েন্টে প্রতিদিন শিক্ষার্থীদের উঠানামা করায়। এছাড়া নামিদামি ১৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৬০টি স্কুলবাস সকাল থেকে বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত চলাচল করে।

স্থানীয়রা জানান, শহরের প্রবেশমুখ ও ব্যস্ত মোড়গুলোতে বাসগুলো প্রায়ই সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকে। অনেক সময় বাসচালকরা যাত্রীর জন্য দীর্ঘ সময় সড়কের ওপরই দাঁড়িয়ে থাকেন। এতে একদিকে সড়কের প্রস্থ কমে যায়, অন্যদিকে অন্যান্য যানবাহনকে ধীরগতিতে চলতে হয়। ফলে পুরো এলাকায় যান চলাচলের গতি কমে বড় ধরনের যানজট তৈরি হয়।

শহরের সাতমাথা এলাকার ব্যবসায়ী মো. রফিকুল ও স্থানীয় বাসিন্দা মীরাজুল জানান, ব্যস্ত সময়ে যখন কয়েকটি বাস একসঙ্গে সড়কে দাঁড়িয়ে পড়ে, তখন পুরো এলাকায় যান চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে রিকশা, অটোরিকশা, মোটরসাইকেলসহ ছোট যানবাহনও আটকে থাকে। এতে সাধারণ মানুষকে দীর্ঘ সময় রাস্তায় অপেক্ষা করতে হয়।

ফুটপাত দখলে পথচারীদের দুর্ভোগ

শহরের যানজট সমস্যাকে আরো জটিল করে তুলেছে ফুটপাত দখল। শহরের স্টেশন রোড, সার্কিট হাউস রোড, নবাববাড়ী রোড, সূত্রাপুর রোড, সাতমাথা ও চেলোপাড়া এলাকার বেশিরভাগ ফুটপাতই বিভিন্ন দোকান, ভ্যানগাড়ি ও অস্থায়ী ব্যবসায়ীদের দখলে রয়েছে। কোথাও কাপড়ের দোকান, কোথাও ফল বা খাবারের স্টল, আবার কোথাও ছোটখাটো হকারদের পসরা বসানো হয়েছে।

শুধু ফুটপাত নয়, দোকানের মালামালও ফুটপাত ছাড়িয়ে সড়ক পর্যন্ত চলে এসেছে। এতে পথচারীদের জন্য জায়গা আরো সংকুচিত হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে তারা সড়কের পাশে বা মাঝামাঝি দিয়ে হাঁটতে শুরু করেন। এতে যানবাহনের গতি কমে যানজট তৈরি হয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ব্যস্ত সময়ে যানজট সমস্যা আরো প্রকট হয়ে ওঠে। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও সাধারণ পথচারীদের ভিড় বাড়লে ফুটপাত দিয়ে চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

অনিয়ন্ত্রিত সিএনজি ও অটোরিকশা

শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়, ব্যস্ত এলাকায় সিএনজি ও অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত স্ট্যান্ড গড়ে উঠেছে। এতে সড়কের বড় একটি অংশ দখল হয়ে যায় এবং অন্য যানবাহনের চলাচল ব্যাহত হয়। সাতমাথা, জিরো পয়েন্ট, শেরপুর রোড, স্টেশন রোড, চেলোপাড়া ও দত্তবাড়িসহ বেশ কয়েকটি ব্যস্ত এলাকায় প্রতিদিনই কয়েকটি অটোরিকশা, সিএনজি সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকে। আবার অনেক চালক যাত্রী পাওয়ার আশায় দীর্ঘ সময় একই জায়গায় অবস্থান করেন। এতে সড়ক সঙ্কুচিত হয়ে যান চলাচলের গতি ধীর হয়ে পড়ে।

অফিস ও স্কুল-কলেজ ছুটির সময় যাত্রীর চাপ বেড়ে গেলে চালকরা বেশি যাত্রী পাওয়ার আশায় মোড়ের কাছাকাছি বা গুরুত্বপূর্ণ সড়কে গাড়ি থামিয়ে রাখেন। এতে কয়েক মিনিটের মধ্যেই ওই এলাকায় যানজট তৈরি হয়। অনেক সময় রিকশা, মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়িগুলো এসব অটোরিকশার কারণে সামনে এগোতে পারে না। এসব অস্থায়ী স্ট্যান্ডের কারণে অনেক সময় মোড়ের দৃশ্যমানতাও কমে যায়। ফলে যানবাহনের চালকদের জন্য দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ে। বিশেষ করে সরু সড়কগুলোতে অটোরিকশা বা সিএনজির সারি দাঁড়িয়ে থাকলে অন্য যানবাহনের চলাচল প্রায় অচল হয়ে পড়ে।

কুরিয়ার ট্রাকের অবাধ বিচরণ

বগুড়া শহরে ১৫টির মতো কুরিয়ার সার্ভিসের অফিস রয়েছে। দিনের ব্যস্ত সময়েও এসব কুরিয়ার সার্ভিসের বড় বড় ট্রাক শহরে ঢুকে পড়ে এবং বিভিন্ন স্থানে দাঁড়িয়ে মালামাল ওঠানামা করে। এতে সড়কের স্বাভাবিক যান চলাচল মারাত্মক ব্যাহত হয়। মুহূর্তের মধ্যেই তৈরি হয় দীর্ঘ যানজট। ফলে ভোগান্তিতে পড়েন হাজারো যাত্রী।

প্রশাসনের উদ্যোগেও সমাধান নেই

যানজট সমস্যা সমাধানের জন্য প্রশাসনের উদ্যোগও কাজে আসছে না। মাঝে মাঝে প্রশাসন ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে ফুটপাতের দোকান সরানো হয়। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই আবার সেই জায়গায় দোকান বসে যায়। ফলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না। এক সপ্তাহ আগে জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান নিজে অভিযান করে পুলিশ প্লাজার সামনে থেকে একটি অবৈধ দোকান উচ্ছেদ করেন। কিন্তু তিনি চলে যাওয়ার পরপরই সেই দোকানটি আবার চালু হয়। গত একমাসে এ ধরনের সাতটি অভিযানের পরও ফুটপাত দখলমুক্ত করা সম্ভব হয়নি।

ট্রাফিক পরিদর্শক (প্রশাসন) সালেকুজ্জামান বলেন, ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত রাখতে নিয়মিত অভিযান চালানো হয়। তবে অভিযান শেষ হলেই দোকানিরা আবার বসে পড়েন।

বগুড়া জেলার ট্রাফিকের দায়িত্বে নিয়োজিত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আতর হোসেন বলেন, বগুড়া যানজটমুক্ত করতে সর্বাত্মক চেষ্টা করছি। তবে রাজনৈতিক ও সামাজিক ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা ছাড়া বগুড়াকে যানজটমুক্ত করা সম্ভব নয়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন