মহাস্থান জাদুঘরের মূল্যবান ৪৭ প্রত্ননিদর্শন নিয়ে ধোঁয়াশা

সবুর শাহ্ লোটাস, বগুড়া

মহাস্থান জাদুঘরের মূল্যবান ৪৭ প্রত্ননিদর্শন নিয়ে ধোঁয়াশা

বগুড়ার মহাস্থান প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘরের হাজার কোটি টাকা মূল্যের ৪৭টি প্রত্ননিদর্শন নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সারা দেশ থেকে আসা দর্শনার্থীদের মধ্যে কৌতূহল ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এ বিষয়ে শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে (ইউএনও) আহ্বায়ক করে ৯ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

জানা গেছে, সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৭ সালে এই ৪৭টি প্রত্ননিদর্শন ফ্রান্সের গিমে জাদুঘরে পাঠানো হয়েছিল। এরপর ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সেখান থেকে প্রত্নসম্পদগুলো ফেরত আসে। এগুলো আসল অবস্থায় দেশে ফিরেছিল কি না তা নিয়ে নতুন করে রহস্য সৃষ্টি হয়। বিষয়টি সারা দেশের মানুষের মধ্যে কৌতূহলের সৃষ্টি করে।

বিজ্ঞাপন

অভিযোগ উঠেছে, ফ্রান্স থেকে দেশে ফেরত আসা অধিকাংশ প্রত্ননিদর্শন পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই বছরের পর বছর স্টোররুমে অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে। প্রশ্ন উঠেছে, এগুলো কি আসল, না কি রেপ্লিকা? বিষয়টি তদন্তে শিবগঞ্জের ইউএনও জিয়াউল ইসলামকে প্রধান করে ৯ সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়েছে।

গত সোমবার শিবগঞ্জ উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় বিষয়টি নতুন করে উঠে আসে। সভায় উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। সভায় কয়েকজন সদস্য ২০০৭ সালে ফ্রান্সফেরত প্রত্ননিদর্শনের প্রকৃত অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। পরে প্রতিমন্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন।

জানা গেছে, ২০০৭ সালে দেশের বিভিন্ন জাদুঘরের গুরুত্বপূর্ণ প্রত্ননিদর্শন ফ্রান্সে প্রদর্শনীর জন্য পাঠানো হয়। এর মধ্যে মহাস্থান জাদুঘরের অন্তত ৪৭টি মূল্যবান প্রত্নসম্পদ ছিল। তৎকালীন সময়ে ফ্রান্সের গিমে জাদুঘরে প্রদর্শনীর জন্য সে দেশের দূতাবাস সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠায়। পরে এ বিষয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয় এবং প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, জাতীয় জাদুঘর ও বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের সঙ্গে ফ্রান্সের তিনটি পৃথক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

২০০৭ সালের ১৮ নভেম্বর সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিবের সভাপতিত্বে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় প্রত্ননিদর্শন পাঠানোর বিষয়ে চূড়ান্ত সম্মতি দেওয়া হয়। তবে প্রদর্শনীর দ্বিতীয় ধাপে একটি মূর্তি বিমানবন্দরে হারিয়ে যাওয়ার ঘটনায় পুরো প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হয়। এরপর ফ্রান্সের সঙ্গে প্রদর্শনী চুক্তি বাতিল করা হয় এবং প্রত্ননিদর্শনগুলো দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। এসব নিদর্শনের ঐতিহাসিক ও প্রত্নমূল্য হাজার কোটি টাকা হতে পারে।

তবে দেশে ফেরার পর এসব প্রত্নসম্পদ আদৌ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছিল কি না, তার কোনো সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।

সূত্র জানায়, ফেরত আসা নিদর্শনের মধ্যে মাত্র দুই-তিনটি জাদুঘরে প্রদর্শনের জন্য রাখা হলেও অধিকাংশই দীর্ঘদিন ধরে স্টোররুমে পড়ে রয়েছে। এ নিয়ে এখন স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও সন্দেহ তৈরি হয়েছে। কারণ ফ্রান্স থেকে ফেরার পরে ওই বাক্সগুলো আর কেউ খুলে দেখেনি।

সংশ্লিষ্ট অনেকের ধারণা, তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত কাস্টডিয়ান আব্দুল জব্বার হয়তো আসল প্রত্ননিদর্শন কালোবাজারে বিক্রি করে তার পরিবর্তে রেপ্লিকা প্রতিস্থাপন করেছে। পরে বিষয়টি আড়াল করতেই সেগুলো স্টোররুমে ফেলে রাখা হয়েছে।

মহাস্থান জাদুঘরের বর্তমান কাস্টডিয়ান রাজিয়া সুলতানা জানান, কিছু সামগ্রী প্রদর্শনের জন্য রাখা হলেও বাকিগুলো স্টোররুমে সংরক্ষিত আছে। যেহেতু এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে, তাই তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না। ফ্রান্স থেকে প্রত্নসম্পদগুলো কবে ফেরত এসেছে, সে তথ্য জানাতেও তিনি অস্বীকৃতি জানান।

আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভা শেষে গত ১১ মে এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, ফ্রান্সে পাঠানো প্রত্ননিদর্শনগুলো আসল না কি রেপ্লিকা, তা তদন্ত করে দেখা হবে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

এমবি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...