আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

বগুড়ার সাত আসন

ঘাঁটি পুনরুদ্ধারে মরিয়া বিএনপি, চমক দেখাতে চায় জামায়াত

সবুর শাহ লোটাস, বগুড়া

ঘাঁটি পুনরুদ্ধারে মরিয়া বিএনপি, চমক দেখাতে চায় জামায়াত

উত্তরাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে খ্যাত বগুড়া বিএনপির পুরোনো ঘাঁটি। জেলার ১২টি উপজেলা নিয়ে সাতটি সংসদীয় আসন গঠিত। এখানে যুগ যুগ ধরে ইসলামপন্থি ও জাতীয়তাবাদী মানুষের আধিক্য বজায় আছে। বিগত নির্বাচনগুলোতেও এর প্রতিফলন দেখা গেছে। অধিকাংশ নির্বাচনে সব আসনে জয়ী হন বিএনপির নেতারা। মাঝে দু-একবার জয় পেয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর নেতারা।

দেড় দশক ভোটাধিকার হরণ করে সারা দেশের মতো বগুড়ায়ও অবৈধভাবে রাজত্ব করেছে আওয়ামী লীগ। ছাত্র-জনতার হাজারো প্রাণের বিনিময়ে সেই অধিকার ফিরে আসায় ভোটের উৎসবে মেতেছেন জেলার বাসিন্দারা। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি শেষ করেছে বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ইসলামী আন্দোলনসহ বিভিন্ন দল। নানা কর্মসূচির মাধ্যমে নেতাকর্মীরা চষে বেড়াচ্ছেন ভোটের মাঠ। সবার তৎপরতা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ঘাঁটি পুনরুদ্ধারে মরিয়া হয়ে উঠেছে বিএনপি আর চমক দেখাতে চায় জামায়াত।

বিজ্ঞাপন

বগুড়া-১ (সারিয়াকান্দি ও সোনাতলা)

যমুনা নদীবিধৌত আসনটিতে বিএনপি থেকে প্রার্থী হয়েছেন দলের কেন্দ্রীয় সদস্য ও সাবেক এমপি কাজী রফিকুল ইসলাম। তাকে ধানের শীষ দেওয়া হলেও তার চলার পথ মসৃণ নয়, কারণ মনোনয়নবঞ্চিতরা এখনো তাকে মেনে নেননি। এখানে পরীক্ষিত বিএনপি নেতা আহসানুল তৈয়ব জাকির মনোনয়ন না পাওয়ায় দলটির নেতাকর্মীরাও বিভক্ত হয়ে পড়েন। এই বিভক্তি কাটিয়ে উঠতে না পারলে আসনটিতে বিএনপির ভোট কমার আশঙ্কা আছে।

জাকির আমার দেশকে বলেন, দল যাকে চূড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে রাখবে, তিনি ধানের শীষ প্রতীক পাবেন। সে ক্ষেত্রে দলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

জামায়াত এখানে দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য ও সাবেক জেলা আমির অধ্যক্ষ শাহাবুদ্দিনকে মনোনয়ন দিয়েছে। তিনি এলাকায় বেকারত্ব দূরীকরণ, নদীভাঙনের স্থায়ী সমাধান করতে পদক্ষেপ নেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন। এছাড়া ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী দলের জেলা কমিটির সদস্য মোস্তফা কামাল পাশা।

বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ)

পুণ্ড্র সভ্যতার তীর্থভূমি শিবগঞ্জ আসনে বিএনপি জোটের শরিক নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। তিনি নমিনেশন ফরম উত্তোলন করলেও ঋণখেলাপি হওয়ায় তার বিষয়ে আশঙ্কা আছে। এ কারণে বিএনপি নেতা মীর শাহে আলমকে দলটির পক্ষ থেকে বিকল্প প্রার্থী করা হয়েছে। মান্নার মনোনয়নপত্র বৈধ হলেও শাহে আলম সরে যাবেন না বলে জানা গেছে।

শাহে আলম আমার দেশকে বলেন, ‘ভোট করার জন্যই বিএনপি মনোনয়ন দিয়েছে। ভোট আমি করবোই। অবশ্যই ধানের শীষ নিয়েই লড়বো।’

জামায়াতের কেন্দ্রীয় শূরা সদস্য মাওলানা শাহাদাতুজ্জামানকে প্রার্থী করা হয়েছে। বিগত সময়ে তিনি একবার এ আসনে সংসদ সদস্য ছিলেন। বিএনপির একাংশ ও নাগরিক ঐক্যের কর্মীরা দ্বিধাবিভক্ত থাকায় এখানে বিএনপির জয়ী হওয়া কঠিন হতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয় ভোটাররা।

ইসলামী আন্দোলন থেকে মুফতি জামাল পাশা, গণঅধিকার পরিষদ থেকে দলটির জেলা কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ও শিবগঞ্জ উপজেলা কমিটির সদস্য সচিব সেলিম সরকার রেজা প্রার্থী হয়েছেন।

বগুড়া-৩ (আদমদীঘি ও দুপচাঁচিয়া)

আসনটিতে বিএনপি থেকে জেলা শাখার সহসভাপতি ও আদমদীঘি উপজেলার সভাপতি আবদুল মুহিত তালুকদার প্রার্থী হয়েছেন। তিনি এলাকায় সভা-সমাবেশ অব্যাহত রেখেছেন। উন্নয়নবঞ্চিত এলাকায় সার্বিক উন্নয়নে পদক্ষেপ নেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।

জামায়াত দুপচাঁচিয়া উপজেলার গুনাহার ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ আবু তাহেরকে দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী করেছে। তরুণ-যুবসমাজসহ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সার্বিক উন্নয়নে তিনি কাজ করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। এছাড়া ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী জেলা কমিটির অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি অধ্যাপক শাহজাহান তালুকদার মাঠে সক্রিয় আছেন।

বগুড়া-৪ (কাহালু ও নন্দীগ্রাম)

বিএনপি থেকে প্রার্থী হয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মোশারফ হোসেন। এখানে কেউ স্বতন্ত্র প্রার্থী না হলেও কোন্দল রয়ে গেছে। এতে বিশেষ সুবিধা পেতে পারে জামায়াত। এমনকি ভেতরে ভেতরে বিএনপির কেউ কেউ দাঁড়িপাল্লার প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এরপরও এলাকার তরুণ যুবকদের তথ্য প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তাদের স্বনির্ভর করাসহ রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সার্বিক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে মাঠে আছেন মোশারফ।

জামায়াত আন্তর্জাতিক ছাত্র ও যুব ফেডারেশনের মহাসচিব ড. মোস্তফা ফয়সাল পারভেজের হাতে দাঁড়িপাল্লার টিকেট তুলে দিয়েছে। তরুণ সমাজের মেধা কাজে লাগিয়ে এলাকার সার্বিক উন্নয়ন, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন করতে পদক্ষেপ নেওয়ার অঙ্গীকার করছেন এই জামায়াত নেতা। এ আসনে বিএনপির একাংশ ধানের শীষের বিরোধী হওয়ায় নির্বাচনের ফসল ঘরে তুলতে চায় জামায়াত। এছাড়া ইসলামী আন্দোলনের জেলা কমিটির সদস্য অধ্যাপক ইদ্রিস আলী হাতপাখার পক্ষে মাঠে সরব আছেন।

বগুড়া-৫ (শেরপুর ও ধুনট)

বিএনপি থেকে জেলা শাখার সাবেক আহ্বায়ক ও সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ ধানের শীষের মনোনয়ন পেয়েছেন। তিনি একাধিকবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য। এলাকার সার্বিক উন্নয়ন করবেন বলে প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছেন। দীর্ঘসময় অবহেলার শিকার এলাকার মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেবেন বলে তিনি অঙ্গীকার করছেন।

জামায়াত থেকে শেরপুর উপজেলা আমির ও উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান দবিবুর রহমান দলের টিকিট পেয়েছেন। দাঁড়িপাল্লায় ভোট চেয়ে মাঠে আছেন, সভা-সমাবেশ করছেন। ভোটারদের কাছে গিয়ে দিচ্ছেন উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি। এছাড়া ইসলামী আন্দোলনের শেরপুর উপজেলা শাখার সভাপতি অধ্যাপক মীর মাহমুদুর রহমান চুন্নুসহ বিভিন্ন দলের বেশ কয়েক প্রার্থী মাঠে আছেন।

বগুড়া-৬ (সদর)

জেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এ আসনে বিএনপি থেকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ধানের শীষ নিয়ে লড়ছেন। তাকে প্রার্থী হিসেবে পেয়ে উজ্জীবিত নেতাকর্মী ও ভোটাররা। এছাড়া প্রতিদিনই সভা-সমাবেশ, গণসংযোগ করছে জেলা বিএনপি ও অঙ্গসংগঠন।

জামায়াত এখানে দলটির শহর শাখার আমির আবিদুর রহমান সোহেলকে প্রার্থী করেছে। তিনি সভা-সমাবেশ করছেন, দিচ্ছেন উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি। ইসলামী আন্দোলন থেকে দলটির জেলা কমিটির সভাপতি আ ন ম মামুনুর রশিদ, এনসিপি থেকে আবদুল্লাহ আল ওয়াকিসহ বিভিন্ন দলের বেশ কয়েক প্রার্থী তৎপর আছেন।

বগুড়া-৭ (গাবতলী ও শাজাহানপুর)

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জন্মভূমি গাবতলীর মাটি বিএনপির অন্যতম ঘাঁটি। এখানে গাবতলী উপজেলা বিএনপির সভাপতি মোর্শেদ মিল্টনকে মনোনয়ন দিয়েছে দলটি। তার পক্ষে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে ব্যাপক প্রচারও চলছে।

জামায়াত এখানে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সহসভাপতি ও দলের মজলিশে শূরার সদস্য গোলাম রব্বানীকে প্রার্থী করেছে। তিনি বিজয়ী হলে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ এলাকার সার্বিক উন্নয়ন করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। এছাড়া ইসলামী আন্দোলন দলের জেলা সেক্রেটারি অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম শফিক ইনসাফভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়ে দলের পক্ষে ভোট চাইছেন।

জেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল করিম বাদশা বলেন, ‘শহীদ জিয়ার জন্মভূমি বগুড়া বরাবরই বিএনপির ঘাঁটি। অবাধ, সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থীরা সব সময় বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। এবারও সেই ধারা অব্যাহত থাকবে—ইনশাআল্লাহ।’

জামায়াতের শহর শাখার আমির আবিদুর রহমান সোহেল বলেন, ‘আমরা প্রত্যাশা করছি, অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হবে। এটা যদি সরকার নিশ্চিত করতে পারে তাহলে আমরা বিপুল ভোটে বিজয়ী হব— ইনশাআল্লাহ।’

সিনিয়র জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ফজলুল করিম জানান, নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত আছেন তারা। খসড়া ভোটকেন্দ্রের তালিকাও প্রস্তুত হয়েছে। সবমিলিয়ে ভোটগ্রহণে এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিবন্ধকতা তিনি দেখছেন না।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...