জুলাই আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতার ওপর হামলার মামলায় জামিন পেতে জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে রাজশাহীর গোদাগাড়ীর মাদক কারবারি আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে। কালামকে বিএনপির সক্রিয় কর্মী দাবি করে তার আইনজীবী আদালতে দুটি প্রত্যয়নপত্র দাখিল করেন। এসব প্রত্যয়নপত্রের একটিতে গোদাগাড়ী পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক পৌর মেয়র আনোয়ারুল ইসলামের স্বাক্ষর ও সিল রয়েছে। তবে আনোয়ারুল ইসলাম জানিয়েছেন, ওই স্বাক্ষর ও সিল তার নয়। প্রত্যয়নপত্রটি জাল।
অপর প্রত্যয়নপত্রে স্বাক্ষর করা পৌর বিএনপির ২ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি হানিফ আলী স্বীকার করেছেন, প্রতিবেশী হওয়ায় আবুল কালামের স্ত্রী তার কাছে গেলে তিনি প্রত্যয়নপত্র দিয়েছেন। তবে এখন এটিকে ভুল হয়েছে বলে দাবি করছেন তিনি।
আদালতে এসব প্রত্যয়নপত্র দাখিলের পর গত ১২ আগস্ট রাজশাহী জেলা ও দায়রা জজ আদালত আবুল কালাম আজাদের জামিন মঞ্জুর করেন। পরে তিনি কারাগার থেকে বের হয়ে যান। জাল প্রত্যয়নপত্রের বিষয়টি সামনে আসার পর তাকে ফের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রাজশাহী জেলার নেতারা।
আবুল কালাম আজাদ গোদাগাড়ী পৌরসভার মহিষালবাড়ি মহল্লার বাসিন্দা। তার বাবার নাম মৃত রবিউল ইসলাম।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আবুল কালাম আজাদ দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে হেরোইন কারবারের সঙ্গে জড়িত। তার বিরুদ্ধে মাদক আইনে সাতটি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলায় তার যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডও হয়েছিল। পরে জামিনে বের হয়ে তিনি আবারও মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়েন বলে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের দাবি।
স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তৎকালীন সংসদ সদস্য ওমর ফারুক চৌধুরীর আশ্রয়-প্রশ্রয়ে ছিলেন আবুল কালাম আজাদ। পুলিশের দাবি, তিনি আগে সক্রিয়ভাবে যুবলীগের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিতেন। সরকার পতনের পর নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করতে অর্থের জোগান দিচ্ছিলেন।
পুলিশ জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আবুল কালাম আজাদ অনেকটা আত্মগোপনে ছিলেন। সম্প্রতি তিনি প্রকাশ্যে আসেন। গত ২০ জুলাই পুলিশ তার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে। পরে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গোদাগাড়ীতে ছাত্র-জনতার ওপর হামলা ও গুলিবর্ষণের ঘটনায় করা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ওই দিনই আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
প্রত্যয়নপত্রে স্বাক্ষর ও সিল জাল
আদালতের নথিপত্রে দেখা গেছে, আবুল কালাম আজাদের জামিনের আবেদনের সঙ্গে তার আইনজীবী তৌসিক আহমেদ মাসুম দুটি প্রত্যয়নপত্র দাখিল করেন। একটি প্রত্যয়নপত্রে গোদাগাড়ী পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক পৌর মেয়র আনোয়ারুল ইসলামের স্বাক্ষর ও সিল রয়েছে। অপরটিতে স্বাক্ষর রয়েছে পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি হানিফ আলীর।
দুটি প্রত্যয়নপত্রেই লেখা হয়েছে, ‘আবুল কালাম আজাদ বিএনপির একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে দীর্ঘদিন যাবৎ নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে দলীয় কর্মকাণ্ডে যুক্ত আছেন। দলের গঠনতন্ত্র ও শৃঙ্খলা মেনে চলার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা প্রশংসনীয়।’
এতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ‘তিনি কোনো প্রকার রাষ্ট্রবিরোধী বা অসামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত নন। তিনি একজন দায়িত্বশীল ও সম্মানিত নাগরিক।’
তবে প্রত্যয়নপত্রটি দেখেই সেটিকে জাল বলে শনাক্ত করেন আনোয়ারুল ইসলাম। তিনি বলেন, আমি স্বাক্ষরে আ ইসলাম লিখি। এখানে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে কী যেন লেখা হয়েছে। এই স্বাক্ষর আমার নয়। সিলও নকল করা হয়েছে। আমি প্রত্যয়নপত্র দিইনি। এটা জাল। এ ধরনের জালিয়াতির ব্যাপারে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। আমি সাধারণ ডায়েরি করব।’
অন্যদিকে, শুধু প্রতিবেশী হওয়ায় আবুল কালামের পক্ষে প্রত্যয়নপত্র দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন ২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি হানিফ আলী। তিনি বলেন, কালামের স্ত্রী ঘুরছিল। তাঁরা আমার প্রতিবেশী। সে হিসেবে প্রত্যয়নপত্র দিয়েছি। এটা ভুল হয়ে গেছে। এখন দেখি কী করা যায়।
আনোয়ারুল ইসলামের নামে জাল প্রত্যয়নপত্র আদালতে দাখিলের বিষয়ে জানতে চাইলে আবুল কালামের আইনজীবী তৌসিক আহমেদ মাসুম বলেন, আসামির আত্মীয়-স্বজনেরা এগুলো এনে দিয়েছে। আমি সত্যায়ন করে আদালতে জমা দিয়েছি। সঠিক না জাল, সেটা তো বলতে পারব না।
আবুল কালাম আজাদের কাছে প্রত্যয়নপত্রের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রত্যয়নটা কোনোভাবে হয়েছে আর কী। যে কোনোভাবে হয়ে আছে, আমি সঠিক বলতে পারব না। এরপরই তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
রাজশাহী জেলা ও দায়রা জজ আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী রইসুল ইসলাম বলেন, জাল প্রত্যয়নপত্র জমা দেওয়া আদালতের সঙ্গে প্রতারণা। এটা আরও বড় অপরাধ। জেল থেকে বের হওয়ার আগেও আমরা জানতে পারলে ব্যবস্থা নিতাম। আগামী ধার্য তারিখে বিষয়টি দেখতে হবে।
প্রত্যয়ন দেননি অন্য নেতারা
কারাগারে থাকা অবস্থায় আবুল কালাম আজাদের স্ত্রী আরমিনা আক্তার বাবলি গোদাগাড়ীর আরও কয়েকজন বিএনপি নেতার কাছে প্রত্যয়নপত্রের জন্য গিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। তবে তারা প্রত্যয়নপত্র না দিয়ে তাকে ফিরিয়ে দেন।
গোদাগাড়ী পৌর বিএনপির সভাপতি মজিবুর রহমান বলেন, আমার কাছে প্রত্যয়ন নিতে এসেছিল। তার কর্মকাণ্ড সম্পর্কে যা শুনেছি, তাতে আমি প্রত্যয়ন দিতে পারি না।
সাধারণ সম্পাদক গোলাম কিবরিয়া বলেন, আমাকেও বলেছিল। আমি জানি না যে সে বিএনপি করে। এ জন্য প্রত্যয়ন দিইনি। সে মাদক কারবারি বলে শুনেছি। অনেক কথা রাজনীতি করার স্বার্থে বলাও যায় না।
সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুল ইসলাম বলেন, প্রত্যয়নের জন্য আমার কাছে এসেছিল। সে আসলে বিএনপি করেনি। সে মাদকের সঙ্গে জড়িত। আমি প্রত্যয়ন দিইনি।
গোদাগাড়ী পৌর যুবদলের আহ্বায়ক মাহবুবুর রহমান বিপ্লব বলেন, আবুল কালাম আজাদ কখনো বিএনপি করেনি। ওরা অন্য জগতের মানুষ। কেউ তাকে প্রত্যয়ন দিতে পারে না।
প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরেও মিথ্যা তথ্য
বিএনপির কর্মী পরিচয় দিয়ে নিরাপত্তা চেয়ে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরেও লিখিত আবেদন করেছেন আবুল কালাম আজাদ। নিজেকে ব্যবসায়ী ও আমদানিকারক উল্লেখ করে ওই আবেদনে তিনি দাবি করেন, জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক আদর্শের অনুসারী হওয়ায় গত ১৭ বছরে তিনি বিভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকার হয়েছেন।
আবেদনে আবুল কালাম আরও দাবি করেন, তিনি প্রতিবছর সরকারকে প্রায় ২৫ থেকে ৩৫ লাখ টাকা ভ্যাট ও আয়কর পরিশোধ করেন।
তবে তার আয়কর নথি ঘেঁটে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। নথি অনুযায়ী, তার টিন নম্বর ৪১২৫৫৩৯৫৪৬৬১। আমদানি-রপ্তানি ও ইটভাটা থেকে বার্ষিক ১২ লাখ ৩০ হাজার টাকা আয় দেখিয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তিনি আয়কর দিয়েছেন ২ লাখ ৯০ হাজার ৭৩০ টাকা। এর আগের অর্থবছরে তিনি কোনো আয়কর দেননি।
অভিযোগ রয়েছে, বিপুল সম্পদের মালিক হয়েও তিনি আয়কর নথিতে তুলনামূলক কম আয় দেখিয়েছেন।
ফের গ্রেপ্তারের দাবি
আদালতে জাল প্রত্যয়নপত্র দাখিল করে জামিন নেওয়ার অভিযোগে আবুল কালাম আজাদকে ফের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রাজশাহী জেলার আহ্বায়ক নাহিদুল ইসলাম সাজু।
তিনি বলেন, কালাম একজন নেতার প্রত্যয়ন জালিয়াতি করেছেন। আবার আরেকজন সত্যিই প্রত্যয়ন দিয়েছেন। যিনি প্রত্যয়ন দিয়েছেন, তিনি জুলাইয়ের শহীদের রক্তের সঙ্গে বেঈমানি করেছেন। আমরা দাবি জানাচ্ছি, দ্রুতই যেন তাঁকে আবার গ্রেপ্তার করা হয়।
জানতে চাইলে গোদাগাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুজন মিঞা বলেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং ছাত্র-জনতার ওপর হামলার ঘটনায় যুক্ত থাকার সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। কে প্রত্যয়ন দিয়েছেন বা না দিয়েছেন, সে বিষয়ে কিছু জানি না। কোনো অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাকে অবশ্যই গ্রেপ্তার করা হবে।
এআরবি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

