নাগেশ্বরীর ১৫ সার ডিলারের ১০ জনই আ.লীগ-জাপার

নাগেশ্বরীর ১৫ সার ডিলারের ১০ জনই আ.লীগ-জাপার

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর ১৪ ইউনিয়ন ও এক পৌরসভা সার ডিলার নিয়োগের তালিকায় ১০ জনই কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির নেতাদের নাম আসায় এলাকায় ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। এ নিয়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে চরম ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। ডিলারশিপ বাতিল দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল শেষে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (ইউএনও) কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন বিএনপি নেতাকর্মীরা।

লালমনিরহাটে সার ডিলার নিয়োগ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে তীব্র বিতর্ক ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। হাতীবান্ধায় চিহ্নিত মাদক কারবারি ও ক্যাসিনো সম্রাট সারের ডিলারশিপ পাওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে সমালোচনার ঝড়।

বিজ্ঞাপন

ঝালকাঠিতে সার ডিলার নিয়োগে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা বঞ্চিত হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। দলীয় পরিচয় ও তদবিরে ডিলার নিয়োগ করায় ক্ষুব্ধ প্রকৃত ব্যবসায়ীরা। বিএনপি নেতাকর্মীদের বাইরে আওয়ামী পরিবারের কয়েকজনও ডিলারশিপ পেয়েছেন।

হবিগঞ্জের ৭৮ ইউনিয়ন এবং ছয়টি পৌরসভায় সার ডিলার নিয়োগ ঘিরে বিতর্কের ঝড় বইছে। স্বচ্ছতা নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী এবং অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানও ডিলারশিপ পেয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী পৌরসভা এবং উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নে সার ডিলার নিয়োগের তালিকা গত ৭ অক্টোবর প্রকাশ করা হয়। তালিকাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় রাজনীতিবিদ ও সচেতন মহলে তুমুল সমালোচনার ঝড় ওঠে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সার ডিলার নিয়োগের ১৫ জনের তালিকায় রায়গঞ্জ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সহসভাপতি শফিকুল ইসলামের ‘মেসার্স ইসলাম ট্রেডার্স’, সন্তোষপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ খলিলুর রহমানের ‘খালেদা ট্রেডার্স’, বামনডাংগা ইউনিয়নে আওয়ামী পরিবার ও এমপিওভুক্ত কলেজের প্রভাষক রওশন আলী খানের ‘রিদম এন্টারপ্রাইজ’, হাসনাবাদ ইউনিয়নে কৃষক লীগ নেতা আজাদ আলীর ‘কামাল ট্রেডার্স’, কালীগঞ্জ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা দীপু চন্দ্র সরকারের ‘দীপালী ট্রেডার্স’, নারায়ণপুর ইউনিয়ন জাতীয় পার্টির সাবেক নেতা ও ইসলামি আন্দোলনের ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী ইয়াকুব আলীর ‘ইয়াকুব ট্রেডার্স’সহ ১০টি প্রতিষ্ঠানের নাম সুপারিশ করা হয় যেসব প্রতিষ্ঠানের পরিচালকদের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। গোয়েন্দা প্রতিবেদন এবং যাচাই-বাছাই কমিটির প্রাথমিক প্রক্রিয়ার মধ্যেও তাদের নাম ডিলার তালিকায় যুক্ত হওয়ায় পুরো বাছাই প্রক্রিয়া নিয়েই নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

নাগেশ্বরী পৌর কৃষক দলের সদস্য সচিব আদম আলী বলেন, ‘এ বছর নাগেশ্বরী ও ভূরুঙ্গামারীতে সারের বেশি সংকট দেখা গেছে। মূলত আওয়ামী ডিলারদের সিন্ডিকেটের কারণেই এমন হয়েছে। অথচ নাগেশ্বরী উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক গোলাম রসুল রাজা এবং সদস্য সচিব মোখলেছুর রহমান মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে সে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির ফ্যাসিস্টদেরই ডিলারশিপ নিয়ে দিয়েছে। ডিলারশিপ পাওয়া ১৫ জনের ১০ জনই ফ্যাসিস্টের দোসর।’

আওয়ামী লীগ ও জাপা নেতারা ডিলারশিপ পাওয়ায় ফেসবুকেও বইছে সমালোচনার ঝড়। উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক রোকনুজ্জামান টুকু ফেসবুক লাইভে এসে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সার ডিলার নিয়োগে আওয়ামী লীগ-জাতীয় পার্টির নেতাদের নাম মেনে নেওয়া যায় না। আমরা এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ গড়ে তুলব।’

এছাড়াও ফুলবাড়ীর ভাঙ্গামোড় ইউনিয়নের ডিলারশিপ পাওয়া মেসার্স কেএম ট্রেডার্সের মালিক মোহাম্মদ আলী, ভূরুঙ্গামারীর বঙ্গসোনাহাট ইউনিয়নের মেসার্স রাকিবুল ট্রেডার্সের মালিক মঞ্জুরুল ইসলাম এবং চর ভূরুঙ্গামারী ইউনিয়নের মেসার্স তাসমি ট্রেডার্সের লিয়াকত আলী চব্বিশ পরবর্তী সময়ে কৌশলে বিএনপি নেতা বনে গেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

ভাঙ্গামোড় ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান তালুকদার বলেন, ‘এখানে যাকে ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে, তিনি চব্বিশের পরের নেতা। এর আগে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করে বিভিন্ন ব্যবসা করতেন। অযোগ্যকে দেওয়া মানেই বুঝে নিতে হবে কীসের বিনিময়ে দিয়েছে।’

নাগেশ্বরী উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব মোখলেছুর রহমান বলেন, ‘এসব ভিত্তিহীন অভিযোগ। নির্বাচিত ডিলারদের নামে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সংশ্লিষ্টতার যে তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, তা অপপ্রচার।’

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবু ফাত্তাহ্ রওশন কবির বলেন, ‘পুরোটাই উপজেলা কমিটি থেকে যাচাই-বাছাই হয়ে এসেছে। আমি আসলে জানি না, কে আওয়ামী লীগ-জাতীয় পার্টি আর কে বিএনপি।’

লালমনিরহাটে মাদক কারবারিও ডিলার

লালমনিরহাটে সার ডিলার নিয়োগের তালিকা প্রকাশের পর স্থানীয় পর্যায়ে তীব্র বিতর্ক ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তালিকা বিশ্লেষণ ও মাঠপর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী ছাড়াও হাতীবান্ধায় চিহ্নিত মাদক কারবারি আর ক্যাসিনো সম্রাটের নাম সার ডিলারের তালিকায় থাকায় ফেসবুকে শুরু হয়েছে সমালোচনার ঝড়। বিতর্কিতরা সুপারিশ পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন মহল।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানান, প্রতিটি এলাকার জন্য তিনটি করে নাম মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। যাকে নিয়োগ দেওয়া হবে, তার নামের পাশে সংকেতপূর্ণ চিহ্ন বসিয়ে দেওয়া হয়। তার নাম তালিকার ১ নম্বর সিরিয়ালে রাখা হয়। তিনজন সংসদ সদস্যের দেওয়া তালিকা থেকেই সার ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কৃষি মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী সার ডিলার নিয়োগে অভিজ্ঞতা, গোডাউন, আর্থিক সচ্ছলতা ও লাইসেন্সকে প্রাধান্য দেওয়ার কথা থাকলেও এবার তা মানা হয়নি।

বাদপড়া একাধিক ব্যবসায়ী জানান, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আবেদন করলেও কেন তাদের বাদ দেওয়া হলো, তার কোনো সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। ব্যবসার অভিজ্ঞতা নেই এমন অনেক ব্যক্তি শুধু ক্ষমতা ও অর্থের জোরে ডিলার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন।

একজন বঞ্চিত ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সারের ব্যবসা করে আসছি। আমার গোডাউন ও লাইসেন্স সব আছে। তারপরও আমার আবেদন বাতিল করা হয়েছে।

জেলা সার বীজ মনিটরিং কমিটির সদস্য সচিব কৃষিবিদ সাইখুল আরেফিন বলেন, উপজেলা কমিটির সুপারিশক্রমে ডিলার নিয়োগের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে এর বেশি কিছু তিনি জানেন না বলে জানান।

ঝালকাঠিতে অভিজ্ঞতা ছাড়াই ডিলার

ঝালকাঠির ৩২ ইউনিয়ন এবং দুটি পৌরসভায় সারের ডিলার নিয়োগে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা বঞ্চিত হয়েছেন। দলীয় পরিচয় ও তদবিরে অভিজ্ঞতা ছাড়াই ডিলার নিয়োগে ক্ষুব্ধ প্রকৃত ব্যবসায়ীরা। বিএনপির পাশাপাশি আওয়ামী পরিবারেরও কয়েকজন ডিলারশিপ পেয়েছেন। জেলায় ৩৪ জন ডিলারের মধ্যে মাত্র সাতজনের সার বিক্রির পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে, বাকিরা নতুন।

নলছিটির ভৈরবপাশা ইউনিয়ন জামায়াতে ইসলামীর আমিরের ছেলে মো. আরাফাত খানের প্রতিষ্ঠান মেসার্স মাকসুদা ট্রেডার্স ডিলারশিপ পেলেও তারা আগে থেকেই এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বলে জানা গেছে। সিদ্ধকাঠি ও রানাপাশা ইউনিয়নে যাদের ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে, তারাও সারের খুচরা ব্যবসায়ী। এ তিন ইউনিয়ন বাদ দিলে নলছিটি পৌরসভা এবং বাকি সাতটি ইউনিয়নে সম্পূর্ণ নতুন ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে, যাদের কোনো অভিজ্ঞতা নেই। সুবিরপুর, নাচোলমহল, সিদ্ধকাঠি, মোল্লার হাট, দপদপিয়া ও রানাপাশা ইউনিয়নে বিএনপি; পৌরসভা, কুলকাঠি ও মগড় ইউনিয়নে আওয়ামী পরিবার এবং ভৈরবপাশা ইউনিয়নে জামায়াত পরিবার থেকে ডিলারশিপ পেয়েছে।

জানা গেছে, সদর উপজেলার ১০ ইউনিয়ন এবং একটি পৌরসভার সব ডিলারই নতুন এবং সবাই বিএনপি পরিবারে। এদের কারো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। ঝালকাঠি পৌরসভায় ডিলারশিপ পাওয়া ইমরান হোসেন খান পৌরসভার ভোটার নন এবং ৫ আগস্টের পর বিএনপিতে এসেছেন বলে অভিযোগ করেছেন সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শওকত হোসেন খোকন মল্লিক।

এ বিষয়ে সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আলী আহমেদ বলেন, আমরাও অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।

রাজাপুরের ছয়টি ইউনিয়নের মধ্যে পাঁচটিতে বিএনপি নেতাকর্মী এবং সদর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ কর্মী ডিলারশিপ পেয়েছেন। এর মধ্যে চারজন আগের ব্যবসায়ী এবং দুটি নতুন ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে।

জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সদস্য সচিব মো. আবদুল্লাহ আল মামুন আমার দেশকে বলেন, আমরা এ নিয়োগ দিইনি। এটা কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে দিয়েছে।

হবিগঞ্জে অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে ডিলারশিপ

হবিগঞ্জের ৭৮ ইউনিয়ন এবং ছয়টি পৌরসভায় সার ডিলার নিয়োগে স্বচ্ছতা নিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী এবং অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে ডিলার অনুমোদন করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা ক্ষুব্ধ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, নবীগঞ্জের ৬ নম্বর কুর্শি ইউনিয়ন যুবলীগ নেতা আতাউর রহমানকে সার ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এতে স্থানীয় বিএনপি ও সাধারণ সার ব্যবসায়ীদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। অভিযোগ রয়েছে, ইনাতগঞ্জ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা আলী হুসেনকে ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হামলার মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাভোগ করে জামিনে রয়েছেন।

বাহুবলের ২ নম্বর পুটিজুরী ইউনিয়নে ডুবাঐ বাজারে আলম ট্রেডিং সেন্টার নামে প্রতিষ্ঠানকে সার ডিলার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এতে ব্যবসায়ীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। স্থানীয় ব্যবসায়ী সাজন মিয়াসহ সার ডিলারের জন্য আবেদনকারীরা জানান, ডুবাঐ বাজারে ওই নামে কোনো দোকান বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বই নেই।

মাধবপুরের জগদীশপুর ইউনিয়নে মোজাম্মেল হক নামে এক ব্যক্তিকে সার ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি আওয়ামী লীগের সক্রিয় কর্মী। তার নিয়োগ বাতিল চেয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন হামদু মিয়া নামে এক ব্যবসায়ী। মোজাম্মেল সাবেক মন্ত্রী মাহবুব আলীর বিশ্বস্ত কর্মী এবং চব্বিশের ৪ আগস্ট মাধবপুরে ছাত্র-জনতার বিপক্ষে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে রাজপথে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

জেলা প্রশাসক ড. জিএম সরফরাজ বলেন, এ ধরনের কোনো অভিযোগ আমাদের কাছে নেই, কেউ লিখিত অভিযোগ করলে আমরা এটি দেখব।

[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন স্থানীয় প্রতিনিধিরা]

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন