আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

আমার দেশ-এ সংবাদ প্রকাশের পর

রূপপুর প্রকল্পে নিয়োগ জালিয়াতি তদন্তে হাইকোর্টের রুল জারি

ওহিদুল ইসলাম সোহেল, ঈশ্বরদী (পাবনা)

রূপপুর প্রকল্পে নিয়োগ জালিয়াতি তদন্তে হাইকোর্টের রুল জারি

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে নিয়োগে অনিয়ম, জাল সনদ ও অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ার অভিযোগ নিয়ে আমার দেশে অনুসন্ধানী সংবাদ প্রকাশের পর নড়েচড়ে বসেছে বিচার বিভাগ। জনস্বার্থে দায়ের করা রিট আবেদনের শুনানি শেষে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়ে রুল জারি করেছে হাইকোর্ট।

বিজ্ঞাপন

রোববার সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সাকিনা বেগমের দায়ের করা জনস্বার্থে রিট পিটিশন নং ২০৪২/২০২৬-এর শুনানি শেষে বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও ফাতেমা আনোয়ারের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ ও রুল জারি করে। আদালত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিবের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে কমিটিকে আট সপ্তাহের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করতে বলা হয়েছে।

গত বছরের ২৭ আগস্ট আমার দেশের শেষের পাতায় ‘মোটা অঙ্কের ঘুষে বড় পদ, জাল সনদে স্থায়ী চাকরি’ শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে রূপপুর প্রকল্পের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এবং জাল সনদের মাধ্যমে স্থায়ী নিয়োগ অনিয়মের তথ্য তুলে ধরা হয়। কয়েকজন কর্মকর্তার পেশাগত অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়। নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগও উঠে আসে, যা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, আমার দেশে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী জনস্বার্থে রিট আবেদন দায়ের করেন। রিটে উল্লেখ করা হয়, গুরুতর অভিযোগ উত্থাপিত হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিন কার্যকর তদন্তে উদ্যোগ না নেওয়ায় বিচারিক হস্তক্ষেপ অপরিহার্য হয়ে পড়ে।

শুনানি শেষে হাইকোর্ট বেঞ্চ সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না—এই মর্মে রুল জারি করেন। পাশাপাশি অভিযোগসমূহের বিষয়ে নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও প্রামাণ্য তদন্ত নিশ্চিত করতে নির্দেশ দেন আদালত। তদন্ত প্রতিবেদনে নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, প্রার্থীদের যোগ্যতার যাচাই, অভিজ্ঞতার মানদণ্ড, প্রশাসনিক অনুমোদন এবং প্রাসঙ্গিক নীতিমালার যথাযথ অনুসরণ হয়েছে কি না—এসব বিষয় সমন্বিতভাবে পর্যালোচনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আইনজীবীদের মতে, ২০১৯ ও ২০২৩ সালের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির আওতায় প্রকল্পের বিভিন্ন পদে একাধিক কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয়। যাদের মধ্যে কয়েকজনের যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগ প্রক্রিয়াটি যথেষ্ট প্রতিযোগিতামূলক ও স্বচ্ছ ছিল না এবং যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই কিছু নিয়োগ সম্পন্ন করা হয়েছে।

অভিযোগের তালিকায় রয়েছে—চিফ ইঞ্জিনিয়ার (ভারপ্রাপ্ত) মুশফিকা আহমেদকে ব্যবস্থাপক পদে অনিয়মের মাধ্যমে নিয়োগ দেয়া হয়। বিজ্ঞপ্তিতে নিউক্লিয়ার ফ্যাসিলিটি বা পাওয়ার প্লান্টে কমপক্ষে ৯ বছরের অভিজ্ঞতা আবশ্যক থাকলেও বাস্তবে তিনি ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন বলে অভিযোগ আছে।

এছাড়া ব্যবস্থাপক পদে আল মামুন ও নাজমুল হোসেনের প্রায় এক বছরের অভিজ্ঞতা ঘাটতির অভিযোগ রয়েছে। উপব্যবস্থাপক পদে নিয়োগপ্রাপ্ত আবু কায়সারের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা ছিল না বলেও অভিযোগ আছে । ঊর্ধ্বতন সরকারি ব্যবস্থাপক পদে রবিউল ইসলামের বিদ্যুৎ সেক্টরে প্রত্যক্ষ কাজের অভিজ্ঞতা না থাকলেও তিনি পলিটেকনিকে চাকরি করে বিদ্যুৎ খাতের একটি ভুয়া সনদ দিয়ে চাকরি নেন। একই পদে মেরাজ আল মামুনের বিরুদ্ধেও জাল সনদের অভিযোগ উঠেছে।

বিশেষজ্ঞ মহল মনে করছেন, রূপপুরের মতো কৌশলগত ও উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ পারমাণবিক অবকাঠামো প্রকল্পে মানবসম্পদ নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মাত্রার স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা অনুসরণ করা অপরিহার্য। এ ধরনের অভিযোগ প্রকল্পের প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা, সুশাসন কাঠামো এবং সেফটি কালচার নিয়ে উদ্বেগের জন্ম দিতে পারে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন