রাজশাহী থেকে নেসকোর কার্যালয় সরানোর উদ্যোগে নতুন বিতর্ক

রাজশাহী থেকে নেসকোর কার্যালয় সরানোর উদ্যোগে নতুন বিতর্ক

উত্তরাঞ্চলের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো) লিমিটেডের প্রধান কার্যালয় রাজশাহী থেকে বগুড়ায় স্থানান্তরের আলোচনা আবারও নতুন করে সামনে এসেছে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর ডিও লেটারকে কেন্দ্র করে কয়েক মাস আগে শুরু হওয়া বিতর্ক নতুন করে জোরালো হয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগের সাম্প্রতিক এক চিঠির পর। ওই চিঠিতে নেসকোর প্রধান কার্যালয় স্থানান্তরের সম্ভাব্য আর্থিক, প্রশাসনিক ও কার্যগত প্রভাব বিশ্লেষণ করে মতামত দিতে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

চিঠিটি প্রকাশ্যে আসার পর রাজশাহীতে রাজনৈতিক, সামাজিক, ব্যবসায়ী ও পেশাজীবী মহলে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের মতে, বিষয়টি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সদর দপ্তর স্থানান্তরের প্রশ্ন নয়; বরং এটি রাজশাহীর প্রশাসনিক মর্যাদা, আঞ্চলিক অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং উত্তরাঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

বিজ্ঞাপন

বিদ্যুৎ বিভাগের কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স-১ শাখা থেকে গত ১৬ জুলাই জারি করা চিঠিতে নেসকোর প্রধান কার্যালয় স্থানান্তরের সম্ভাব্য সব ধরনের আর্থিক ও প্রশাসনিক প্রভাব বিশ্লেষণ করে মতামত দিতে বলা হয়েছে।

তবে এটি নেসকোর সদর দপ্তর স্থানান্তরের প্রথম উদ্যোগ নয়। চলতি বছরের মার্চ মাসে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর একটি ডিও লেটারের পরিপ্রেক্ষিতে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর রাজশাহীবাসীর প্রবল প্রতিক্রিয়া ও জনমতের চাপে উদ্যোগটি অনেকটাই থেমে যায়। সাম্প্রতিক চিঠির মাধ্যমে সেই বিতর্ক আবারও নতুন মাত্রা পেয়েছে।

নেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মশিউর রহমান জানিয়েছেন, তিনি মন্ত্রণালয়ের চিঠি পেয়েছেন। বিষয়টি পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গে আলোচনা করে কোম্পানির মতামত সরকারের কাছে পাঠানো হবে। তিনি বলেন, এটি মূলত সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয়।

এদিকে স্থানান্তরের আলোচনা সামনে আসতেই রাজশাহীর রাজনৈতিক, সামাজিক, ব্যবসায়ী ও পেশাজীবী সংগঠনগুলো এক প্ল্যাটফর্মে এসে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছে। নেসকোর প্রধান কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, রাজশাহী একটি বিভাগীয় শহর। এখান থেকে নেসকোর মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সদর দপ্তর সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

তাদের বক্তব্য, এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে রাজশাহীর প্রশাসনিক গুরুত্ব ক্ষুণ্ণ হবে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য, আবাসন, পরিবহন ও স্থানীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বক্তারা আরো হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হলে রাজশাহীবাসী বৃহত্তর আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবে। প্রয়োজনে হরতালসহ কঠোর কর্মসূচিও ঘোষণা করা হবে।

এর আগে গত ১০ মার্চ নেসকোর সদর দপ্তর স্থানান্তরের আলোচনা শুরু হলে ভূমিমন্ত্রী ও রাজশাহী-২ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য মিজানুর রহমান মিনু বলেছিলেন, নেসকোর সদর দপ্তর রাজশাহীতেই থাকবে।

সে সময় তিনি বলেন, রাজশাহী শুধু একটি বিভাগীয় শহর নয়, এটি দেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী প্রশাসনিক কেন্দ্র। ব্রিটিশ আমলেও বিদ্যুৎ বিভাগের সদর দপ্তর রাজশাহীতে ছিল। তৎকালীন প্রশাসনিক কাঠামোয় রাজশাহীর অধীনে শুধু উত্তরাঞ্চল নয়, বর্তমান ভারতের মালদা, পশ্চিম দিনাজপুর ও জলপাইগুড়ি জেলাও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই ঐতিহাসিক ও প্রশাসনিক গুরুত্ব বিবেচনায় নেসকোর সদর দপ্তর রাজশাহীতেই থাকা উচিত। বিষয়টি নিয়ে তিনি বিদ্যুৎমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলবেন বলেও জানিয়েছিলেন।

রাজশাহীর নাগরিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা বলেন, নেসকোর মতো একটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সদর দপ্তর অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হলে সেটি শুধু একটি দপ্তর স্থানান্তরের ঘটনা হবে না; বরং এটি উত্তরাঞ্চলের প্রশাসনিক কাঠামোর জন্য দীর্ঘমেয়াদে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হয়ে উঠতে পারে। স্বাধীনতার পর রাজশাহী উত্তরাঞ্চলের অন্যতম প্রধান প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠলেও বিভাগ পুনর্বিন্যাস এবং একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান অন্যত্র চলে যাওয়ায় সেই গুরুত্ব ধীরে ধীরে কমেছে। নেসকোর সদর দপ্তরও সরিয়ে নেওয়া হলে সেই সংকট আরো প্রকট হবে বলে তাদের আশঙ্কা।

তারা আরো বলেন, রাজশাহীতে বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং দক্ষ মানবসম্পদের যে শক্তিশালী ভিত্তি রয়েছে, তা নেসকোর মতো প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। তাই সদর দপ্তর স্থানান্তরের মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে শুধু ভৌগোলিক সুবিধা নয়, এর দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক উন্নয়নের প্রভাবও সমান গুরুত্ব দিয়ে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

নগরীর সাহেববাজার এলাকার ব্যবসায়ী জয়নাল আবেদিন বলেন, একটি সদর দপ্তর মানে শুধু কয়েকটি অফিসকক্ষ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে শত শত কর্মকর্তা-কর্মচারী, আবাসন, পরিবহন, হোটেল-রেস্তোরাঁ, সেবাখাত এবং অসংখ্য ক্ষুদ্র ব্যবসা। ফলে এমন একটি প্রতিষ্ঠান অন্যত্র চলে গেলে তার প্রভাব পুরো স্থানীয় অর্থনীতিতে পড়বে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক এক শিক্ষক বলেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অবস্থান নির্ধারণে আঞ্চলিক ভারসাম্য একটি মৌলিক নীতিগত বিষয়। যখন রাজধানীকেন্দ্রিক উন্নয়ন নিয়ে সমালোচনা বাড়ছে, তখন বিভাগীয় শহর থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান সরিয়ে নেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। প্রশাসনিক সুবিধার পাশাপাশি আঞ্চলিক অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়-সুবিধার বিশ্লেষণও জরুরি।

নগরীর লক্ষ্মীপুর এলাকার বাসিন্দা মোছা. রুবিনা খাতুন বলেন, রাজশাহীতে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম কমে যাচ্ছে—এমন ধারণা মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে। ফলে নেসকো নিয়েও উদ্বেগ সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। তিনি বলেন, সরকার যেন জনগণের মতামত বিবেচনায় নিয়েই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

অন্যদিকে, স্থানান্তরের পক্ষে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো যে যুক্তি তুলে ধরছে, তা হলো—নেসকোর কার্যক্রম বর্তমানে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬ জেলায় বিস্তৃত। সদর দপ্তর রাজশাহীতে থাকায় রংপুর অঞ্চলের কিছু প্রশাসনিক কাজে অতিরিক্ত সময় লাগে। সেই বাস্তবতা যাচাই করতেই সম্ভাব্যতা নিরূপণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তবে আন্দোলনকারীদের প্রশ্ন, যদি মূল সমস্যা প্রশাসনিক সমন্বয় হয়, তাহলে আধুনিক প্রযুক্তি, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক কার্যালয়গুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি করেও কি সেই সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়? তাদের মতে, একটি প্রতিষ্ঠানের সদর দপ্তর স্থানান্তরই একমাত্র সমাধান কি না, সেই প্রশ্নেরও সুস্পষ্ট উত্তর প্রয়োজন।

নেসকোর প্রধান কার্যালয় স্থানান্তরের বিষয়টি এখন আর শুধু রাজশাহী ও বগুড়ার মধ্যকার প্রশাসনিক বিতর্কে সীমাবদ্ধ নেই। এটি উত্তরাঞ্চলের উন্নয়ন কৌশল, বিভাগীয় শহরগুলোর মর্যাদা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিকেন্দ্রীকরণের নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত বৃহত্তর জাতীয় আলোচনায় পরিণত হয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন