স্বামীহারা বৃদ্ধা হাজেরা বেওয়ার জীবনে প্রকৃতির আঘাত যেন ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে নেমে এসেছে। মানুষের সহযোগিতায় পাওয়া এক শতাংশ জমির ওপর গড়ে তোলা ছোট্ট ঘরটি সম্প্রতি ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। এর ফলে ভূমিহীন ও চরম অসহায় এই নারী হারিয়েছেন তার মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়টুকুও।
বুধবার সন্ধ্যায় কালবৈশাখী ঝড়ে ঘরটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরদিন বৃহস্পতিবার নাটোরের লালপুর উপজেলার নবীনগর গ্রামে হাজেরা বেওয়ার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, চারদিকে ধ্বংসের চিহ্ন। ভাঙা ঘরের সামনে বসে নির্বাক হয়ে কাঁদছেন তিনি। তাকে সান্ত্বনা দিতে ছুটে এসেছেন প্রতিবেশীরা। কিন্তু যে নারীর মাথার ওপর ছাদটুকুও আর নেই, সান্ত্বনার বুলিতে কি তাঁর বুকের হাহাকার থামে?
হাজেরা বেওয়ার জীবনের গল্প দীর্ঘদিনের অভাব, বঞ্চনা আর নিরন্তর সংগ্রামের। প্রায় ১৪ বছর আগে স্বামী জামাত মণ্ডল মারা যাওয়ার পর পাঁচ মেয়েকে নিয়ে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন তিনি। কোনো পুত্রসন্তান নেই, নিজের নামে নেই এক টুকরো জমিও। প্রতিবেশীদের সহযোগিতায় কোনো রকমে দিন কাটে তার। পাঁচ মেয়ের মধ্যে আবার দুজনই স্বামী হারিয়ে বিধবা হয়েছেন। নিজের জীবন চালানোই যেখানে মুশকিল, সেখানে অসহায় মেয়েদের ভবিষ্যৎ চিন্তাও তাকে প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে বেড়ায়।

এত বছর ধরে ভূমিহীন ও অবহেলিত থাকলেও সরকারি কোনো আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর জোটেনি তার ভাগ্যে। শেষ পর্যন্ত এক হৃদয়বান ব্যক্তির দেওয়া এক শতাংশ জমিতে ছোট্ট একটি ঘর তৈরি করে কোনোমতে বেঁচে ছিলেন তিনি। ঝড়ে সেই ঘরটিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এখন চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তিনি।
প্রতিবেশী রবিউল ইসলাম বলেন, হাজেরা বেওয়া অত্যন্ত অসহায় একজন নারী। ১৪ বছর ধরে স্বামী নেই, পাঁচ মেয়ে থাকলেও কোনো ছেলে নেই। গত ১৫-১৬ বছরে তিনি সরকারি কোনো অনুদান বা সহযোগিতা পাননি বললেই চলে। গত বছর স্থানীয় চেয়ারম্যান তাকে একটি বিধবা ভাতার কার্ড করে দিলেও নানা জটিলতায় শেষ কিস্তির টাকা তার মোবাইলে আসেনি।
এ বিষয়ে ঈশ্বরদী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল আজিজ রঞ্জু বলেন, তিনি অতীতে কী ধরনের সরকারি সহায়তা পেয়েছেন তা আমার জানা নেই। তবে আমি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর তার অসহায়ত্বের কথা বিবেচনা করে একটি বিধবা ভাতার কার্ডের ব্যবস্থা করে দিয়েছি।
হাজেরা বেওয়ার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে লালপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কাজী মো. মেশকাতুল ইসলাম বলেন, খবর পাওয়ার পরপরই খোঁজ নেওয়া হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে তার বাড়ি পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা হবে।
ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হাজেরা বেওয়ার এখন প্রয়োজন কেবল সান্ত্বনা নয়, স্থায়ীভাবে মাথা গোঁজার একটি নিরাপদ ঠাঁই এবং সামাজিক সুরক্ষার নিশ্চিত বলয়। প্রশাসনের আশ্বাসের দ্রুত বাস্তবায়নই পারে এই বিধবা নারীর মুখে সামান্য হাসি ফোটাতে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


-72e6f1.jpg)
