কুড়িগ্রামে নদীভাঙন, আশ্রয়ণের ঘরে আশ্রয়হীন মানুষ


কুড়িগ্রামে নদীভাঙন, আশ্রয়ণের ঘরে আশ্রয়হীন মানুষ
ছবি: আমার দেশ

বাকপ্রতিবন্ধী শান্তনা খাতুন (২৫)। কথা না বলতে পারলেও ইশারা ইঙ্গিতে বোঝালেন সরকার থেকে দেওয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এখন তাদের থাকার জায়গা নেই। প্রতিবেশীর সহায়তা নিয়ে শান্তনা বেগম জানান, ২০২২ সালে সরকারের দেওয়া একটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর পেয়েছিলেন তার বাবা।

সেখানে তিনি মা-বাবা আর বোনসহ থেকেছেন প্রায় ৪ বছর। কিন্তু এ বছর আর থাকতে পারলেন না সেই ঘরে। ব্রহ্মপুত্রের করাল গ্রাসে তিনি ও তার পরিবার এখন ভিটে মাটি ছাড়া। এখন তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন অস্থায়ী আশ্রয় কেন্দ্রে।

বিজ্ঞাপন

জাহিনুর বেগম (৩৪) এই গ্রামেই তার ছিলো নিজস্ব ৬ শতক জমি। ধার-দেনা করে স্বামী- সস্তান নিয়ে তিনি গড়ে ছিলেন নিজ বাড়ি। তবে সে ঘর আর স্থায়ী হয়নি। নদী ভাঙনের কবলে পড়ে ভিটেমাটি হারিয়ে এখন আছেন তিনি অন্যের জায়গায় ছোট্ট একটি ঘর তুলে। ভাঙন, ভিটেমাটি হারানো, অন্যের বাড়িতে আশ্রয় কিংবা অস্থায়ী আশ্রয় কেন্দ্রে থাকা শুধু এই দুই পরিবারেরই গল্প নয়, এমন আরও করুণ চিত্র ফুটে আছে কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার চর বিশালপাড়া গ্রামে।

এলাকাবাসীর দাবি, শুধু এই গ্রামে সরকারের আশ্রয়ণ প্রকল্পের প্রায় ৫০টি বাড়ি ব্রহ্মপুত্রের গর্ভে বিলীন হয়েছে। আর ভাঙনের কবল থেকে রক্ষা করতে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে আরো ২০টি বাড়ি। প্রতিনিয়ত এই চরে ভাঙনের ভয়ালরূপ দেখাচ্ছে সর্বনাশা ব্রহ্মপুত্র। ভাঙনের ঝুকিতে এখনও প্রায় ২০০ পরিবার।

রোজিনা আক্তারের ভাঙনের গল্পটা একটু ভিন্ন। প্রথমে ভেঙেছে তার ঘরসংসার, পরে ভেঙেছে তার বাড়ি-ঘর। ২০২৫ সালে ভেঙেছে সংসার। সেই থেকেই তিনি তার বাবার সঙ্গে থাকছেন আশ্রয়ণের ঘরে। তবে সে সুখ আর বেশি দিন সইল না রোজিনার। এবারের নদীভাঙনের কবলে পড়ে গেল তাদের আশ্রয়ণের ঘর। পরিবারসহ তারাও আশ্রয় নিলেন অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নদীভাঙনে বিপর্যস্ত কড়াই বরিশাল চর। এই চরে যে আশ্রয়ণের ঘর ছিল, তা এখন দেখে বোঝার উপায় নেই।

শুধু মাটিতে পড়ে রয়েছে ইট-সুরকি। কেউ কেউ ভাঙনের কবল থেকে শেষ সম্বল রক্ষা করতে খুলছে ঘরের টিনের চাল, বেড়া। ভেঙে নিয়ে যাওয়া ঘরের আঙিনায় গল্প করতে বসেছেন রাশেদা, নুর নাহার, স্বপ্না বেগম, ফতেমা বানু। তাদের ঘর ছিল সেখানেই। এখন যা শুধুই স্মৃতির আঙিনা। সেখানে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কো হয় তাদের। ভিটেমাটি হারানো নুর নাহার (৪০) বলেন, ৩ লাখ টাকা দিয়া জমি কিনছি।

বাড়ি করতে খরচ গেছে আরো ২ লাখ। এখন সব গেল নদীতে। আমরা কই যাব। আমাগো যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। একই বক্তব্য শাহীদা খাতুনের। তারও সম্প্রতি ২ কাঠা জমিসহ বাড়ি তলিয়ে গেছে নদীগর্ভে। সবার মুখে এক কথ আমরা যাব কই? আমাদের যাওয়ার জায়গা নেই।

গ্রামটি এখন বলা চলে পুরুষশূণ্য। কেউ কেউ জীবিকার তাগিতে পাড়ি জমিয়েছে ঢাকা শহরে।

এই গ্রামের বাসিন্দা হাফিজুর রহমান। তিনি জানালেন, এখন পর্যন্ত নদীতে সরকারি-বেসরকারি ঘরই গেছে প্রায় ৭৫টি। প্রতিদিনই নদী গিলে খাচ্ছে ঘর। আমরা এর সমাধান চাই। স্থায়ী বাঁধ চাই।

ভাঙনে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর হারানো আঁখি বেগম বললেন, ‘মাথার ওপর কোনো ঠাঁই থাকল না। সরকারের দেওয়া ঘরে ছিলাম। নদী সেইটাও কাইড়া নিল। আমরা নিঃস্ব। দশ বছরের একটা প্রতিবন্ধী মেয়ে আর সংসার নিয়া এখন কই যাবো, সেটাই বুঝতে পারতেছি না।’

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান জানালেন, ‘চরে স্থায়ী নদীরক্ষা প্রকল্পের জন্য তাদের কোনো বরাদ্দ নেই। তবে জরুরি ভিত্তিতে দেড় হাজার জিও ব্যাগ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং সেগুলো ডাম্পিংয়ের কাজ চলমান। বর্তমানে আমরা ৩৮টি পয়েন্টে নদী ভাঙন ঠেকানোর জন্য কাজ করছি।’

এমএইচ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন