বদরগঞ্জে ফ্যামিলি কার্ড শুমারিতে নিয়োগ পেল ছাত্রলীগ-যুবলীগ

বদরগঞ্জে ফ্যামিলি কার্ড শুমারিতে নিয়োগ পেল ছাত্রলীগ-যুবলীগ
আমার দেশ গ্রাফিক্স

‎রংপুরের বদরগঞ্জে ফ্যামিলি কার্ড শুমারির তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর এ নিয়ে ব্যাপক অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে । তালিকায় স্থান পেয়েছেন নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নেতাকর্মীরা। এছাড়া মৌখিক পরীক্ষায় অনুপস্থিত থেকেও চূড়ান্ত তালিকায় নাম ওঠা, একই পরিবারের একাধিক সদস্যকে মনোনয়ন, এক ইউনিয়নের আবেদনকারীকে অন্য ইউনিয়নে নিয়োগের অভিযোগও রয়েছে। আর এসব অনিয়মে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সমাজসেবা কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলেছেন নিয়োগপ্রত্যাশীরা।

তাদের একটি অংশ দাবি, নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বদরগঞ্জের ইউএনও আঞ্জুমান সুলতানা এবং উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম। তাদের অভিযোগ, চূড়ান্ত তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে যথাযথ মূল্যায়নের পরিবর্তে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা প্রভাবশালী মহলের সুপারিশ কাজ করেছে।

বিজ্ঞাপন

তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে বদরগঞ্জের ইউএনও আঞ্জুমান সুলতানা আমার দেশকে বলেন, কারও কোনো অভিযোগ থাকলে লিখিতভাবে জানাতে হবে। অভিযোগ পেলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা শরিফুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। পরে মেসেজ পাঠানো হলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।

‎‎সংশ্লিষ্ট সূত্র ও নিয়োগপ্রত্যাশীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ফ্যামিলি কার্ড শুমারির তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার পদে ২২ জুলাই থেকে ২৯ জুলাই পর্যন্ত আবেদন গ্রহণ, যাচাই-বাছাই এবং ব্যবহারিক পরীক্ষার কার্যক্রম চলে। প্রার্থীদের অভিযোগ, সব প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরও নির্ধারিত ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে ফল প্রকাশ করা হয়নি। প্রায় এক সপ্তাহ পর ৬ আগস্ট চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হয়।

এদিকে, বদরগঞ্জ উপজেলা শিবিরের সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম ফ্যামিলি কার্ড শুমারির সুপারভাইজার পদে চূড়ান্ত মনোনীত হয়েও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগ তুলেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি নিজের নাম প্রত্যাখ্যান করে নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে পুনঃতদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

‎তিনি বলেন, একটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও বৈষম্যহীন নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রত্যাশায় সাধারণ শিক্ষার্থী ও আবেদনকারীদের দাবির সঙ্গে একমত হয়ে প্রতিবাদস্বরূপ চূড়ান্ত তালিকায় প্রকাশিত নিজের নাম তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন।

‎ফল প্রত্যাখ্যান করে গোপীনাথপুর ইউনিয়নের চৌধুরীপাড়া গ্রামের চূড়ান্ত তালিকায় মনোনীত প্রার্থী মাসুদ রানাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে পোস্ট করেছেন বলে জানা গেছে। ‎তাদের এমন অবস্থানের পর প্রশ্ন উঠেছে— যদি চূড়ান্ত তালিকায় মনোনীত প্রার্থীরাই তালিকা নিয়ে আপত্তি তোলেন, তাহলে পুরো নিয়োগপ্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ছিল?

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এছাড়া নিয়োগে একই পরিবারের দুই সদস্যের নাম চূড়ান্ত তালিকায় উঠেছে। ‎গোপীনাথপুর ইউনিয়নের চৌধুরীপাড়া গ্রামের বাসিন্দা শফিকুল ইসলামের দুই ছেলে মাসুদ রানা ও মমিন ইসলাম চূড়ান্ত তালিকায় মনোনীত হয়েছেন ।

‎কুতুবপুর ইউনিয়নের নিয়োগপ্রত্যাশী সাদ্দাম হোসেন অভিযোগ করেছেন, কুতুবপুর সরদারপাড়া গ্রামের আব্দুর রহিমের মেয়ে রিনা বানু মৌখিক পরীক্ষায় স্বশরীরে উপস্থিত না হয়েও চূড়ান্ত তালিকায় মনোনীত হয়েছেন।

বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের দলুয়া গ্রামের দুলু মিয়ার ছেলে সবুজ বাদশা উপজেলা ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কয়েকজন। তার নামও চূড়ান্ত তালিকায় রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

‎লোহানীপাড়া ইউনিয়নের ঘিরনই মধ্যটারী গ্রামের আব্দুল হাকিমের ছেলে মাসুদ রানার বিরুদ্ধেও নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে।

‎বদরগঞ্জ উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে কর্মরত রুপালি বেগম নামের এক কর্মচারীর ছেলে চূড়ান্ত তালিকায় মনোনীত হয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া চূড়ান্ত তালিকায় চৌধুরীপাড়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মাহমুদুল হাসান এবং লালবাড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক বীথিকা রায়ের নাম থাকায় খবর সৃষ্টি হয়েছে।

দামোদরপুর ইউনিয়নের প্রার্থী আকতারুল ইসলাম বলেন, ভাইভা ও ব্যবহারিক পরীক্ষায় সব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছি। এরপরও তালিকায় নাম নেই। কেন বাদ দেওয়া হলো, তার সঠিক ব্যাখ্যা চাই।

‎রামনাথপুর ইউনিয়নের প্রার্থী হাবিব বলেন, পরীক্ষা দেওয়ার পর আমরা আশা করেছিলাম মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে ফলাফল হবে। কিন্তু ফল প্রকাশের পর বিভিন্ন অসঙ্গতির অভিযোগ উঠেছে।

‎আবেদনকারীদের দাবি, নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কের অবসানে পুরো প্রক্রিয়াটি পুনরায় যাচাই করা হোক। বিশেষ করে প্রতিটি প্রার্থীর আবেদনপত্র, শিক্ষাগত যোগ্যতার কাগজপত্র, ভাইভা ও ব্যবহারিক পরীক্ষার নম্বর, উপস্থিতির তালিকা, মূল্যায়নপত্র এবং চূড়ান্ত তালিকা পুনঃযাচাইয়ের ব্যবস্থা করা।

‎এ বিষয়ে রংপুর জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক সাবেক এমপি অধ্যাপক চক্রবর্তী আমার দেশকে বলেন, যেহেতু নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে এটাকে একটু যাচাই করে দেখানো দরকার।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন